খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে চালানো সামরিক পদক্ষেপের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিনিদের বিভিন্ন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা শুরু করেছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। এরই ধারাবাহিকতায় তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আল আজরাক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। জর্ডানে এই হামলার কিছু সময় পরেই পার্শ্ববর্তী দেশ কুয়েতেও উচ্চ শব্দে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজতে শুরু করে। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, বুধবার (১০ জুন) সকালে তারা কঠিন জ্বালানি চালিত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে জর্ডানের ওই মার্কিন ঘাঁটিতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। উক্ত ঘাঁটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসদস্যদের আবাসন রয়েছে এবং সেখানে মার্কিনিদের অত্যন্ত অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করা আছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময়েও জর্ডানের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের সতর্কতামূলক সাইরেন বাজেনি।
এদিকে কুয়েতের সেনাবাহিনী এক বিশেষ বিবৃতিতে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জানিয়েছে যে, সম্ভাব্য যেকোনো শত্রুতামূলক হামলার আশঙ্কায় দেশটিতে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হচ্ছে। কুয়েতের সামরিক কমান্ড পরবর্তী সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি না করা পর্যন্ত দেশের সর্বস্তরের জনগণকে অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছে। সেনাবাহিনীর বিজ্ঞপ্তিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, কুয়েতের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের যেকোনো ধেয়ে আসা আকাশযান বা অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুসমূহকে মাঝ আকাশেই প্রতিহত করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং সক্রিয় রয়েছে। একই সাথে দেশের সাধারণ নাগরিকদের যেকোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিহার করে আবশ্যিকভাবে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচারিত তথ্যের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জর্ডান ও কুয়েতে এই চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের প্রধান ঘাঁটিতেও অত্যন্ত শক্তিশালী হামলা চালায় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। ভৌগোলিকভাবে পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশ বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর এই পঞ্চম নৌবহরের প্রধান সদর দপ্তর অবস্থিত। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে যখন এই অঞ্চলে একটি ব্যাপক যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তখনো বাহরাইনের রাজধানীতে বড় ধরনের সামরিক হামলা পরিচালনা করেছিল ইরান।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক এই চরম সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত সোমবার, যখন অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। ওই ঘটনার পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, ইরানই সামরিক উপায়ে তাদের ওই হেলিকপ্টারটি আকাশ থেকে ভূপাতিত করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতির এই অভিযোগের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা কেন্দ্রীয় কমান্ড সরাসরি ইরানের উপকূলবর্তী বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় পাল্টা সামরিক হামলা জোরদার করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেই বিমান হামলার জের ধরেই মূলত আজ বুধবার সকালে ইরান জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে এই পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক নং | আক্রান্ত বা সতর্ক অবস্থানে থাকা অঞ্চল | সংশ্লিষ্ট সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জাম | বর্তমান পরিস্থিতি ও গৃহীত পদক্ষেপ |
| ১ | জর্ডান (আল আজরাক) | মার্কিন সেনাসদস্য ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান | ইরানের কঠিন জ্বালানি চালিত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা |
| ২ | কুয়েত (দেশব্যাপী) | কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা | সতর্কতামূলক সাইরেন এবং নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ |
| ৩ | বাহরাইন (রাজধানী ও উপকূল) | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর | ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী কর্তৃক পূর্ববর্তী ও বর্তমান হামলা |
| ৪ | হরমুজ প্রণালি (উপকূলীয় এলাকা) | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচি সামরিক হেলিকপ্টার | হেলিকপ্টার ধ্বংসের পর মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের বিমান হামলা |
সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বর্তমানে এক চরম সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের সামরিক বাহিনী একে অপরের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে, যার ফলে এই অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে।