খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
মৌলভীবাজারের রাজনগরে স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর নিজ বাড়ির উঠানে মরদেহ মাটিচাপা দিয়ে প্রায় ২০ দিন ঘটনাটি গোপন রাখার অভিযোগে আলমগীর হোসেন (৩৮) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে বাড়ির উঠান খুঁড়ে উদ্ধার করা হয়েছে স্ত্রী জাহেদা বেগমের (২৭) অর্ধগলিত মরদেহ। এই নৃশংস ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ জুন রাতে পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে আলমগীর হোসেন ও তার স্ত্রী জাহেদা বেগমের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই বিরোধের একপর্যায়ে আলমগীর স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটি গোপন রাখতে তিনি নিজ বাড়ির উঠানে একটি গর্ত খুঁড়ে সেখানে মরদেহ মাটিচাপা দেন। এরপর দীর্ঘ প্রায় তিন সপ্তাহ তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেষ্টা করেন, যাতে প্রতিবেশী কিংবা স্বজনদের মধ্যে কোনো সন্দেহের সৃষ্টি না হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার প্রায় ২০ দিন পর সোমবার আলমগীর নিজেই রাজনগর থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, তার স্ত্রী কাউকে কিছু না জানিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন এবং সম্ভবত গোপনে বিদেশে চলে গেছেন। কিন্তু অভিযোগ দায়েরের সময় তার বক্তব্যে একাধিক অসংগতি এবং আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা। এ কারণে তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আরও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
পুলিশের ধারাবাহিক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে একপর্যায়ে আলমগীর ভেঙে পড়েন। পরে তিনি স্বীকার করেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে তিনি স্ত্রীকে হত্যা করেছেন এবং মরদেহ বাড়ির উঠানে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে খননকাজ চালায়। কিছুক্ষণ পর মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় জাহেদা বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ।
মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়ির আশপাশে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভিড় জমে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জাহেদাকে এলাকায় দেখা যাচ্ছিল না। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা থাকলেও এমন ভয়াবহ পরিণতির কথা কেউ কল্পনাও করেননি। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই থানায় গিয়ে স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ করে তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছিল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আলমগীরের দেওয়া তথ্য এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার করা মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ, হত্যার ধরন এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আরও পরিষ্কার হবে বলে তদন্ত কর্মকর্তারা আশা করছেন।
রাজনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফরিদ উদ্দিন আহমদ ভূঁইয়া জানান, অভিযুক্ত আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের পর প্রমাণ গোপন করার কাজে অন্য কেউ সহযোগিতা করেছে কি না, অথবা ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত ছিলেন কি না, তাও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এমন ঘটনায় শুধু হত্যার অভিযোগই নয়, অপরাধের প্রমাণ নষ্ট বা গোপন করার অভিযোগও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। তাই ঘটনার প্রতিটি দিক যাচাই করে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে এমন নৃশংস অপরাধের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের মাধ্যমে পুরো ঘটনার সত্যতা আদালতের সামনে তুলে ধরতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।