টানা কয়েকদিনের নিঝুম বৃষ্টিপাত রূপ নিয়েছে অতি ভারী বর্ষণে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সাগরের জোয়ার। দুইয়ের যুগলবন্দীতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে চরম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নগরের প্রধান প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে এখন গোড়ালি থেকে হাঁটুসমান পানি। কোথাও কোথাও পানি কোমর অবধি ঠেকেছে। এর ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে জোয়ার-ভাটার এই নগরের স্বাভাবিক জনজীবন। রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ নগরবাসী। পরিস্থিতি বিবেচনায় নগরের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
রেকর্ড বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস
চট্টগ্রাম পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে রেকর্ড ২৮২ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত করা হয়েছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী, কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৮৮ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত হলে তাকে ‘অতি ভারী বৃষ্টি’ বলা হয়। সেই হিসাবে চট্টগ্রামে এবার স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত তিন দিন ধরে শুরু হওয়া এই বৃষ্টিপাত মঙ্গলবার ভোর থেকে আরও তীব্র আকার ধারণ করে, যা নগরের নিম্নাঞ্চলগুলোকে পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে দেয়।
জলমগ্ন নগরের চালচিত্র ও জনভোগান্তি
নগরের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র আগ্রাবাদসহ কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, ফরিদার পাড়া, চান্দগাঁও, চকবাজারের তেলেপট্টি গলি, কাট্টলীর ঈশান মহাজন সড়ক এবং হালিশহরের কে ও এল ব্লকের সোনালি আবাসিক, বসুন্ধরা আবাসিক, রামপুর ও আনন্দীপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলমগ্ন।
বিশেষ করে আগ্রাবাদ ও কাতালগঞ্জ এলাকায় সকাল থেকেই হাঁটুপানি থইথই করছে। আগ্রাবাদ এলাকার এক চাকরিজীবী জোবায়ের হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সকালবেলা অফিসে যাওয়ার সময় পুরো এলাকা জলমগ্ন থাকায় তাঁদের চরম বেগ পেতে হয়েছে। অনেককে বাধ্য হয়ে নোংরা পানি মাড়িয়েই গন্তব্যে রওনা দিতে হয়েছে। অন্যদিকে, ফরিদার পাড়ার বাসিন্দা ইফতেখার উদ্দিন জানান, ঘরের দোরগোড়ায় পানি চলে আসায় সকাল থেকেই তাঁরা কার্যত গৃহবন্দী হয়ে পড়েছেন। জরুরি প্রয়োজনেও বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ঝোড়ো হাওয়ায় নগরের উত্তর কাট্টলীর ঈশান মহাজন সড়কে বিশালাকার গাছ উপড়ে পড়েছে। ফলে ওই সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা স্থানীয়দের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনের বক্তব্য
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমকে জানান, টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণের সাথে আজ সকালে সাগরের জোয়ার যুক্ত হওয়ায় পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নগরের বেশ কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নালা ও খালগুলো সচল রাখার চেষ্টা করছেন, যার ফলে কিছু কিছু এলাকা থেকে পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতীতে যেসব এলাকা সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যেত—যেমন মুরাদপুর, বহদ্দারহাট এবং ২ নম্বর গেট এলাকা—সেসব জায়গায় এবার এখনো পানি ওঠার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ও স্থায়ী সমাধানের প্রশ্ন
নগরের স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চডিএ) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যৌথভাবে চারটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সরকারি তথ্যমতে, গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে এই প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান রয়েছে এবং গত মার্চ মাস পর্যন্ত এই খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ হাজার৪০৮ কোটি টাকা।
এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও নগরের এই বারংবার ডুবুডুবু অবস্থা প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নাগরিক মনে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। এর আগে চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল স্মরণকালের ভয়াবহতম জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছিল চট্টগ্রাম। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টির ধরন পাল্টাচ্ছে, তাই দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত টেকসই ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া এই বাণিজ্যিক রাজধানীকে পুরোপুরি জলাবদ্ধতা মুক্ত করা কঠিন হবে।



