খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
ওমান উপকূলের অদূরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে আবারও একটি তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, গত সোমবার ‘অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাতে একটি তেলের ট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি এবং একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাঝেই এই আকস্মিক হামলার ঘটনা ঘটল। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই নৌপথে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউকেএমটিও-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওমানের উপকূলীয় গ্রাম লিমাহ থেকে মাত্র ৮ নটিক্যাল মাইল পূর্বে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বারে এই হামলার ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, অজ্ঞাত একটি বস্তু ট্যাংকারটির বাঁ পাশে (পোর্ট সাইড) আঘাত হানলে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। তবে প্রাথমিক স্বস্তির বিষয় হলো, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত কিংবা সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ার মতো পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং এই হামলার পেছনে কারা জড়িত তা উদঘাটনে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। ইউকেএমটিও এই রুটে চলাচলকারী সকল বাণিজ্যিক জাহাজকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার এবং যেকোনো সন্দেহজনক গতিবিধি অবিলম্বে কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছে।
সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিটি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সংঘাতের শুরুর দিকেই ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথটি অবরুদ্ধ করে ফেলে। ফলস্বরূপ বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয় এবং এই রুট দিয়ে নৌযান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারে, যেখানে হু হু করে বাড়তে থাকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। তেহরানের এই পদক্ষেপের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে এবং বেশ কিছু প্রতিশোধমূলক সামরিক হামলা চালায়।
দীর্ঘ সংঘাতের পর, গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরান এই কৌশলগত নৌপথটি পুনরায় সচল করা এবং স্থায়ীভাবে সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে (MoU) স্বাক্ষর করে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অনেকটাই স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। তবে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, যুদ্ধপূর্ববর্তী অবাধ ব্যবস্থায় আর সহজে ফেরা হবে না। বর্তমানে তেহরান কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে, তাদের উপকূল বরাবর অনুমোদিত নির্ধারিত করিডরের বাইরে অন্য কোনো রুট বা পথ কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ ব্যবহার করতে পারবে না।
হরমুজ প্রণালি হলো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান লাইফলাইন। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই জলপথের ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতির নির্ভরশীলতার চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। নিচের তালিকায় হরমুজ প্রণালির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বের মূল ডেটা ও পরিসংখ্যানগুলো তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | সূচক ও পরিসংখ্যানের বিবরণ | তথ্যের বিবরণ ও পরিমাণ |
| ১ | বিশ্বব্যাপী মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহ | প্রায় ২০ শতাংশ (এক-পঞ্চমাংশ) |
| ২ | ২০২৪ সালে দৈনিক গড় তেল পরিবহন | প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল |
| ৩ | বার্ষিক জ্বালানি বাণিজ্যের আনুমানিক আর্থিক মূল্য | প্রায় ৬০ হাজার কোটি (৬০০ বিলিয়ন) ডলার |
| ৪ | এশীয় বাজারে রপ্তানির হার (২০২২ সালের তথ্য) | মোট পরিবাহিত জ্বালানির প্রায় ৮২ শতাংশ |
| ৫ | চীনের একক নিয়ন্ত্রণ (ইরানি তেল আমদানিতে) | ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ |
| ৬ | প্রধান ব্যবহারকারী দেশসমূহ (পারস্য উপসাগরীয়) | ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও ইউএই |
| ৭ | লিমাহ গ্রাম থেকে দুর্ঘটনাস্থলের দূরত্ব | ৮ নটিক্যাল মাইল পূর্বে |
| ৮ | সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতি | ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর |
| ৯ | প্রধান আমদানিকারক অঞ্চল | এশিয়ার দেশসমূহ (চীন, জাপান, ভারত ইত্যাদি) |
| ১০ | যুদ্ধকালীন প্রভাব | নৌযান চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস ও তেলের মূল্যবৃদ্ধি |
পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলো—যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত, ইরাক এবং কাতার তাদের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির জন্য এই একটিমাত্র রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং এই নতুন হামলার ঘটনা এই রুটের বাণিজ্যিক নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। সমঝোতা চুক্তির পরও এমন চোরাগোপ্তা হামলা ইঙ্গিত দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত জলপথে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনা কতটা জটিল ও চ্যালেঞ্জিং।