খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ৯:৯ এএম
তীব্র জ্বালানিসংকটের মধ্যে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় কিউবাজুড়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। সোমবার (৬ জুলাই) দেশটির প্রায় এক কোটি মানুষ হঠাৎ করেই বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েন। এতে রাজধানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, পানি সরবরাহ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কিউবার সরকার জানিয়েছে, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জরুরি ভিত্তিতে কাজ চলছে। তবে ঠিক কখন জাতীয় গ্রিড পুরোপুরি সচল হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময় জানানো হয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান ‘ইলেকট্রিক ইউনিয়ন’ জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিড আকস্মিকভাবে ভেঙে পড়ার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ পুনরুদ্ধারে বিশেষ জরুরি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
দেশটিতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। কিউবার বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই তেলনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানি করতে না পারায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্রমেই কমে আসে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিড বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সংকট আরও গভীর হওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবায় তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর অনেক দেশ কিউবায় জ্বালানি রপ্তানিতে সতর্ক অবস্থান নেয়। এর ফলে বিদেশ থেকে তেল আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং বিদ্যমান সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কিউবার বিভিন্ন শহরে গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। কর্মস্থল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বহু মানুষ প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন না। বিদ্যুৎ না থাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ও বিভিন্ন সেবাখাতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে স্বাস্থ্য খাত। বিভিন্ন হাসপাতালে হাজার হাজার জরুরি অস্ত্রোপচার স্থগিত করতে হয়েছে। অনেক চিকিৎসাসেবা সীমিত আকারে পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানি উত্তোলন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ রান্নাবান্নাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজেও চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন।
রাজধানী হাভানার ৩৬ বছর বয়সী বাসিন্দা লিনা মে বলেন, বাবাকে জানিয়েছি এখন কাঠকয়লা কিনতে হবে, না হলে রান্না করা সম্ভব হবে না। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। আরেক বাসিন্দা মারিও পেদ্রোসো বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই দেশে পর্যাপ্ত তেল আসছে না। এই অবস্থায় কষ্ট সহ্য করা ছাড়া সাধারণ মানুষের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কিউবা নিজেদের চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ জ্বালানি উৎপাদন করতে সক্ষম। অবশিষ্ট জ্বালানির জন্য দেশটি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষে রাশিয়া থেকে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করা হলেও এপ্রিলের শেষ নাগাদ সেই মজুত শেষ হয়ে যায়। এরপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আগে থেকেই এলাকাভিত্তিক দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অনেক এলাকায় দিনে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ ছিল না। তবে এবার জাতীয় গ্রিড পুরোপুরি বিকল হয়ে যাওয়ায় সেই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিয়েছে।
এটি চলতি বছরে কিউবার প্রথম বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয় নয়। এর আগে মার্চ ও মে মাসেও দেশটিতে বড় ধরনের ব্ল্যাকআউটের ঘটনা ঘটেছিল। ধারাবাহিক এই বিদ্যুৎ সংকট দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। সংকট কাটিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা এখন কিউবা সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য