খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুলাই ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
বাংলা গানের অন্যতম প্রধান বাতিঘর, কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমান এবার নিজের জীবনকে মলাটবন্দি করেছেন। প্রকাশ পেয়েছে তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত আত্মজীবনী ‘লোকে বলে প্রেম আমি বলি জ্বালা’। মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে এক বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই বইটির মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে এই সুরসম্রাজ্ঞীকে শুভেচ্ছা জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন বরেণ্য সংগীতশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী, কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপাসহ দেশের সংস্কৃতি ও সংগীত অঙ্গনের একঝাঁক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
নিজের গাওয়া কালজয়ী গান ‘লোকে বলে প্রেম’-এর তুমুল জনপ্রিয় লাইন থেকেই আত্মজীবনীর এই নামকরণ করেছেন ফেরদৌসী রহমান। বইয়ের এমন নামকরণের পেছনের গভীর দর্শনটি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি নিজেই। শিল্পীর ভাষায়, সংগীতের প্রতি তাঁর যে আমৃত্যু অনুরাগ, সেটিই আসলে তাঁর কাছে ‘প্রেম’। আর এই ভালোবাসার সুরকে সারাজীবন নিখুঁতভাবে লালন করতে গিয়ে যে নিরন্তর সাধনা, ত্যাগ, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটিই তাঁর কাছে ‘জ্বালা’।
অনুষ্ঠানে ফেরদৌসী রহমান বেশ বিনয়ের সঙ্গে বলেন, নিজের জীবনে বিশেষ কোনো বড় কাজ তিনি করতে পেরেছেন বলে মনে করেন না। তবে এই বইয়ের পাতায় পাতায় তিনি ধরে রেখেছেন ফেলে আসা সময়ের বহু স্মৃতি, অনেক চেনা-অচেনা মানুষের কথা আর ইতিহাসের নানা বাঁক বদলের গল্প। বিশেষ করে বইটিতে ফুটে উঠেছে পুরোনো ঢাকার সেই হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, নানান পদের খাবার আর মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপনের জীবন্ত দলিল, যা বর্তমান প্রজন্মের পাঠকদের কাছে দারুণ এক খোরাক হবে।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এই গুণী শিল্পীর দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা সোনালী স্মৃতি রোমন্থন করেন তাঁর দীর্ঘদিনের পরম বন্ধু ও সহশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতার শুরু। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে ‘ডাকবাবু’ চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মতো দ্বৈত কণ্ঠে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সাঙ্গীতিক সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পল্লীগীতি সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের যোগ্য কন্যা হওয়ায় ফেরদৌসী রহমান একদম ছোটবেলা থেকেই অবিভক্ত উপমহাদেশের প্রখ্যাত সব সংগীতজ্ঞদের অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার ও সান্নিধ্য পাওয়ার বিরল সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, যা তাঁর শিল্পীজীবনকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে আবেগঘন বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা। তিনি ফেরদৌসী রহমানকে বাংলা সংগীতের এক জীবন্ত ‘হিমালয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, আধুনিক গান, নজরুলসংগীত, ধ্রুপদী সংগীত থেকে শুরু করে পল্লীগীতি—সব ধারার গানেই ফেরদৌসী রহমানের যে অবিশ্বাস্য ও সমান দক্ষতা, তা গোটা উপমহাদেশেই এক বিরল দৃষ্টান্ত।
বর্ণিল এই উৎসবের শুরুতে শ্রদ্ধেয় এই শিল্পীর প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁরই গাওয়া দুটি কালজয়ী গান—‘লোকে বলে প্রেম’ এবং ‘আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি’ গেয়ে শোনান বর্তমান সময়ের সুপরিচিত শিল্পী অনুপমা মুক্তি।
১৯৪১ সালের ২৮ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে জন্মগ্রহণ করা ফেরদৌসী রহমানের সংগীতের হাতেখড়ি হয়েছিল মূলত নিজের বাবার হাত ধরেই। ১৯৪৭ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে তাঁর কণ্ঠে প্রথম গান প্রচারিত হয়। দেশভাগের পর তাঁরা সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। এরপর ১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাক বা চলচ্চিত্রের নেপথ্য কণ্ঠে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। ষাট ও সত্তরের দশকে প্রায় আড়াই শ চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়ে তিনি মাতিয়েছেন শ্রোতাদের। ১৯৬৪ সালে ঢাকা টেলিভিশনের (বিটিভি) উদ্বোধনী দিনের প্রথম অনুষ্ঠানেও গান পরিবেশন করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের অত্যন্ত জনপ্রিয় নতুন কুঁড়ি ও শিশুদের গানের অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’-র খালামণি হিসেবে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গানের আলোয় আলোকিত করেছেন।
সংগীতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৭ সালে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদকসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এই মহীয়সী নারী। এবার এই বইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের জীবনের পাশাপাশি একটি গোটা প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতির জানালা খুলে দিলেন পাঠকদের জন্য।
মন্তব্য