ভারী বর্ষণ, বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে চলমান ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ ঘোষণা করেছে সরকার। একই সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে দুটি প্রশ্নে ত্রুটি থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত সব পরীক্ষার্থীকে ওই দুটি প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্তও জানানো হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৫তম কার্যদিবসে কার্যপ্রণালিবিধির ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী এ ঘোষণা দেন। বিকেল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে মন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রের মাধ্যমে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এটি দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষাগুলোর একটি, যেখানে ফলাফলের ওপর নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ নির্ধারিত হয়।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক টানা ভারী বর্ষণ, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি ঢল এবং বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার কয়েকটি নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। তবে শুধু এই পাঁচ জেলাই নয়, দেশের আরও বিভিন্ন স্থানে এমন শিক্ষার্থী রয়েছেন, যারা অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত দিনে পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হতে পারেননি।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, কোনো শিক্ষার্থী যেন শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে না পড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেসব পরীক্ষার্থী বৈধ ও অনিবার্য কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত পুনঃনির্ধারিত তারিখে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এতে পরীক্ষার মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তাদের সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।
তিনি আরও বলেন, এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে দুটি প্রশ্নে ত্রুটি ধরা পড়ার বিষয়েও সংসদে ব্যাখ্যা দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং দায়ীদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
মন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে যে ত্রুটি ছিল, তার দায় কোনোভাবেই পরীক্ষার্থীদের ওপর বর্তাবে না। ফলে ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থী পূর্ণ নম্বর পাবে। এতে প্রশ্নপত্রের ভুলের কারণে কোনো শিক্ষার্থীর ফলাফল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় এই দুটি সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে, অন্যদিকে প্রশ্নপত্রের ত্রুটির কারণে সম্ভাব্য বৈষম্যও নম্বর প্রদানের মাধ্যমে দূর করা হয়েছে। এর ফলে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা কিংবা বন্যার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরীক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার নজির রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা স্থগিত, পুনঃতফসিল ঘোষণা কিংবা বিকল্প ব্যবস্থার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। এবারের সিদ্ধান্তও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের এই ঘোষণার মাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে কোনো শিক্ষার্থী যাতে মূল্যায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক বা কারিগরি ত্রুটির দায় পরীক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না। ফলে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অধিক ন্যায্য ও মানবিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিই আবারও তুলে ধরেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মন্তব্য