খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০২৬, ১:১৮ পিএম
বাংলাদেশে গত ছয় মাসে মব-সহিংসতা ও গণপিটুনির মতো আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে এই ধরনের ২৬১টি সহিংস ঘটনায় অন্তত ১৩৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে মব-সহিংসতার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ২৫৬ জন। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর তৈরি করা একটি অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে (জানুয়ারি-জুন) এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। আজ বুধবার (১৫ জুলাই) মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।
সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় এবার গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছরের এই একই সময়ে দেশে ১৪১টি মব-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল, যাতে ৬৭ জন নিহত এবং ১১৯ জন আহত হন। এইচআরএসএস জানিয়েছে, প্রধানত চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের অভিযোগ, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং ধর্মীয় অবমাননার মতো অজুহাত তুলে এসব আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। দেশের মূলধারার ১৬টি জাতীয় দৈনিক ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং সংস্থার নিজস্ব মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ও ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এই বিশদ পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর ৫০টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যাতে অন্তত ৫৬ জন আহত হন। এই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৯টি মন্দির ও ১৫টি উপাসনালয়ের প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ৪৩টি বাড়িঘরে হামলা এবং ৪টি জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। এর বিপরীতে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর ১০টি হামলার ঘটনায় ৪ জন আহত হয়েছিলেন। সে বছর ১টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা ও ১৮টি বসতবাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল।
শ্রমিক অধিকার ও তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দেশের চিত্রটি বেশ নাজুক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে দেশজুড়ে ৩৩১টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৭৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ১ হাজার ৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যাটি ছিল তুলনামূলক কম; সেবার ১১২টি ঘটনায় ৫৯ জন নিহত ও ৭২০ জন আহত হন। এর বাইরে, কর্মক্ষেত্রের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় পড়ে এ বছর ২১৬ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, যা গত বছরের ৪৩ জনের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে ২৬ জন শ্রমিক গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ২ জন গৃহকর্মী নিহত ও ৪ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
দেশের এই সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার কারণেই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিচার বিভাগ ও পুলিশ প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সাথে দেশের সাধারণ নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী এবং সুশীল সমাজকে মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মন্তব্য