খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুলাই ২০২৬, ১:৪৩ পিএম
“কেউ জন্মগতভাবে অন্য মানুষকে ঘৃণা করতে শেখে না; মানুষকে যেমন ঘৃণা করতে শেখানো যায়, তেমনি ভালোবাসতেও শেখানো যায়।” — নেলসন ম্যান্ডেলা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কেবল একটি দেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য প্রেরণার উৎস। নেলসন রোলিহ্লাহলা ম্যান্ডেলা তাঁদেরই অন্যতম। তিনি ছিলেন বর্ণবাদ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক; ক্ষমাশীলতা, মানবতা ও শান্তির এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের এমভেজো গ্রামে এক অভিজাত থেম্বু রাজপরিবারে তাঁর জন্ম। প্রতিবছর এই দিনটি বিশ্বব্যাপী ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়, মানবসেবা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়নের পর তিনি জোহানেসবার্গে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দেশের মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদার সংগ্রামই তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
১৯৪৩ সালে তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (ANC)-এ যোগ দেন এবং ১৯৪৪ সালে দলের ইয়ুথ লিগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেন। পরবর্তীতে উমখন্তো উই সিযওয়ে (Umkhonto we Sizwe)-এর অন্যতম নেতা হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধে নেতৃত্ব দেন।
১৯৫৬ সালে দেশদ্রোহের অভিযোগে তাঁকে এবং আরও ১৫০ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর বিচার চলার পর তাঁরা সবাই নির্দোষ প্রমাণিত হন। কিন্তু সংগ্রাম থামেনি। ১৯৬২ সালে তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৬৪ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তী ২৭ বছর তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন, যার অধিকাংশ সময় কেটেছে কুখ্যাত রবেন দ্বীপ কারাগারে। কিন্তু কারাবাস তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি; বরং তিনি হয়ে ওঠেন নিপীড়িত মানুষের আশা, সাহস ও প্রতিরোধের বিশ্বজনীন প্রতীক।
১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি মুক্তি লাভ করেন। কারামুক্তির পর প্রতিশোধের পথ নয়, তিনি বেছে নেন ক্ষমা, পুনর্মিলন ও শান্তির পথ। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা সফল হয় এবং বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটে।
১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো সব বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিহিংসার পরিবর্তে জাতীয় ঐক্য ও পুনর্মিলনের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
১৯৯৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা ও এফ. ডব্লিউ. ডি. ক্লার্ক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। মানবাধিকার, সাম্য, গণতন্ত্র ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান আজও বিশ্বজুড়ে সমানভাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম এবং মানবতার বার্তা আজও কোটি কোটি মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে।
নেলসন ম্যান্ডেলা আমাদের শিখিয়েছেন— প্রকৃত বিজয় প্রতিশোধে নয়, ক্ষমায়; প্রকৃত শক্তি ঘৃণায় নয়, ভালোবাসায়; আর প্রকৃত নেতৃত্ব ক্ষমতায় নয়, মানুষের হৃদয় জয় করার মধ্যেই নিহিত।
শ্রদ্ধাঞ্জলি এই মহান মানবতাবাদী, শান্তির দূত ও বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের অবিস্মরণীয় মহানায়ক নেলসন ম্যান্ডেলার প্রতি।
মন্তব্য