খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
গাজীপুরের শ্রীপুরে দাবি করা চাঁদা না পেয়ে এক ব্যবসায়ীকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে রাতভর মধ্যযুগীয় কায়দায় পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক শ্রমিকদল নেতা ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, গ্যাসের চুলায় লোহার রড লাল করে গরম করে সজীব মিয়া (৩০) নামের ওই যুবকের শরীরের অন্তত ১০০টি স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। নির্যাতনের একপর্যায়ে তাঁর হাত, পা ও কোমর ভেঙে দিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি হিসেবে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় পুলিশ পাহারায় তিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
নির্যাতনের শিকার সজীব মিয়া শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি দেওচালা গ্রামের মো. কফিল উদ্দিনের ছেলে। অন্যদিকে অভিযুক্ত মো. শরিফ সরকার (৪৩) মাওনা ইউনিয়নের মাওনা গ্রামের বাসিন্দা এবং গাজীপুর জেলা শ্রমিকদলের আহ্বায়ক কমিটির বর্তমান সদস্য।
মামলা ও পারিবারিক সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, গত ২১ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে শরিফ সরকার ও তাঁর সহযোগীরা শ্রীপুরের এমসি বাজারে সজীবের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। সজীব টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সেখানেই তাঁকে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করা হয়। পরবর্তীতে শরিফ সরকারের নিজস্ব প্রাইভেটকারে তুলে এমসি বাজার সংলগ্ন স্বপ্নপুরী হোটেলের পেছনে তাঁদের ব্যক্তিগত কার্যালয়ের টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাতভর চলে নির্মম নির্যাতন।
খবর পেয়ে সজীবের বাবা কফিল উদ্দিন ও তাঁর ভাতিজা আনিছ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সজীবকে রক্ষার চেষ্টা করলে আনিছকেও বেধড়ক মারধর করা হয়। সারা রাত নির্যাতন চালানোর পর ভোররাতে পুলিশ ডেকে এনে সজীবকে আওয়ামী লীগ নেতা ও রাজনৈতিক হত্যা মামলার আসামি হিসেবে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। স্বজনরা জানান, সজীব সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল করেন না, তবে পেশাগত কারণে এক সাবেক আওয়ামী লীগ নেতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখভাল করতেন।
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে সজীবের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে দ্রুত গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে শ্রীপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাজাহারুল ইসলাম জানান, সজীবকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলেও তাঁর শরীর জুড়ে গুরুত আঘাতের চিহ্নের কারণে বিচারক তাঁকে গ্রহণ না করে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা প্রদানের নির্দেশ দেন।
পুড়িয়ে দেওয়া ও ভেঙে ফেলা শরীরের বিভিন্ন অংশ নিয়ে সজীবের মা খালেদা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, ছেলের শরীরে নির্যাতন ছাড়া আর কোনো ভালো জায়গা অবশিষ্ট নেই। লাল গরম রড দিয়ে অন্তত ১০০ জায়গায় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর পর আসামিদের হুমকির মুখে তাঁরা থানায় তাৎক্ষণিক লিখিত আবেদন জমা দিতেও চরম আতঙ্কে ছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি শ্রীপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত শ্রমিকদল নেতা শরিফ সরকার মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, সজীব একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় বিএনপির নেতাকর্মীরা তাঁকে ধরে পুলিশের হাতে দিয়েছেন, তাঁকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি।
অন্যদিকে শ্রীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম জানান, সজীব বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলার আসামি হলেও তাঁকে যেভাবে নির্মম মারধর করা হয়েছে তা চরম বেআইনি। বিষয়টি আদালতকে অবহিত করা হয়েছে এবং ভুক্তভোগীর মারধরের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু হয়েছে। গাজীপুর জেলা শ্রমিকদলের সদস্যসচিব আবুল কালাম প্রধান জানান, অভিযুক্ত নেতার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও নানান বিতর্কের অভিযোগ রয়েছে। কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় দল নেবে না এবং প্রমাণ মিললে তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।