রাজবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায় অরক্ষিত ও অনুমোদনহীন লেভেলক্রসিং ঘিরে বাড়ছে রেল দুর্ঘটনার ঝুঁকি। জেলার রেলপথে থাকা ১৫৪টি লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে ৮৭টি অনুমোদনহীন এবং শতাধিক পারাপারের স্থানে নেই গেটম্যান বা বেরিয়ার। ফলে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হচ্ছেন পথচারী, মোটরসাইকেল, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা। অসতর্কতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির কারণে এসব স্থানে ঘটছে সংঘর্ষ, আহত হওয়া এবং প্রাণহানির ঘটনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে রাজবাড়ী এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়াসহ বিভিন্ন রেল দুর্ঘটনায় ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এত বিপুল প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনা কমাতে অনুমোদনহীন লেভেলক্রসিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি অরক্ষিত বৈধ ক্রসিংগুলোতে দ্রুত গেটম্যান ও বেরিয়ার স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
রাজবাড়ী রেলওয়ে এলাকার গোয়ালন্দ ঘাট থেকে পাংশার মাছপাড়া এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গা জংশন থেকে গোপালগঞ্জের গোবরা পর্যন্ত রেলপথে বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে মোট ১৫৪টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ৬৭টি বৈধ এবং ৮৭টি অবৈধ। স্থানীয় মানুষের চলাচলের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন সময়ে রেলওয়ের অনুমোদন ছাড়াই এসব পারাপারের পথ তৈরি হয়েছে।
রেলওয়ের তথ্য বলছে, ১৫৪টি লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ৫১ থেকে ৫৪টিতে বেরিয়ারসহ গেটম্যানের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ শতাধিক পারাপারের স্থানে ট্রেন আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তাকর্মী নেই। এসব জায়গায় ট্রেনের গতিপথ ও সময় সম্পর্কে ধারণা না থাকা কিংবা সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অনুমোদনহীন ক্রসিংগুলো বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দারা পরে আবার সেগুলো খুলে দেন। এ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু একটি পথ বন্ধ করে দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। স্থানীয়দের চলাচলের প্রয়োজন, বিকল্প পথের অভাব এবং দীর্ঘদিনের ব্যবহারের কারণে অনেক জায়গায় এসব অনিয়ন্ত্রিত পারাপারের পথ আবার চালু হয়ে যায়।
রাজবাড়ীর ওপর দিয়ে নিয়মিত ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, গোয়ালন্দ ঘাট ও পোড়াদহসহ বিভিন্ন গন্তব্যের ট্রেন চলাচল করে। সুন্দরবন, বেনাপোল, মধুমতি ও টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন ট্রেন এবং কমিউটার ট্রেন এই অঞ্চলের রেলপথ ব্যবহার করে। ফলে ব্যস্ত রেলপথের পাশে অনিয়ন্ত্রিত পারাপারের সংখ্যা বেশি থাকলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।
কালিকাপুর রেলব্রিজেও বড় ঝুঁকি
লেভেলক্রসিংয়ের পাশাপাশি কালুখালী উপজেলার কালিকাপুর রেলব্রিজকেও স্থানীয়রা বিপজ্জনক স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে চলন্ত ট্রেনের ছাদে অবস্থানকারী যাত্রীদের জন্য ব্রিজটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। স্থানীয়দের দাবি, চলতি বছর এই এলাকায় কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত কালিকাপুর রেলব্রিজটির উচ্চতা প্রায় ১৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। ভবিষ্যতে সেতুটির উচ্চতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমান কাঠামোর কারণে ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীদের জন্য বিপদের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারাবি জানান, রাজবাড়ী থেকে পাংশার দিকে যাওয়ার পথে কালিকাপুর রেলব্রিজটি তুলনামূলক নিচু। ট্রেনের ছাদে অবস্থানকারী কোনো ব্যক্তি ব্রিজের কাঠামোর খুব কাছাকাছি চলে আসতে পারেন। তাই ট্রেন ছাড়ার আগে ছাদে কেউ উঠেছে কি না, তা নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সৈকত শতদলও ব্রিজটিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে রেলপথে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ট্রেন চলাচল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
অসচেতনতাও দুর্ঘটনার বড় কারণ
রেলওয়ের সহকারী লোকোমাস্টার এস এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বিশেষ কোনো কারণ না থাকলে ট্রেনের নির্ধারিত চলাচলের সময় বা পথ সাধারণত পরিবর্তন হয় না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেরই কোন পথে কখন ট্রেন চলাচল করে, সে বিষয়ে ধারণা থাকার কথা। তারপরও কেউ কেউ অমনোযোগী হয়ে রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করেন। কখনো ট্রেন আসার সময় দ্রুত পার হওয়ার চেষ্টাও করেন। এমন পরিস্থিতিতে চালক জরুরি ব্রেক প্রয়োগ করলেও অনেক সময় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয় না।
রাজবাড়ী রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার তন্ময় কুমার দত্ত বলেন, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ আইনত দণ্ডনীয়। যাত্রীরা যাতে ছাদে উঠতে না পারেন, সে জন্য স্টেশনে নিরাপত্তাকর্মীরা নজরদারি করেন। ট্রেন ছাড়ার আগে ও আসার সময় মাইকিং করে যাত্রীদের সতর্ক করা হয় এবং ছাদে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানানো হয়।
রাজবাড়ী রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান জানান, পুরো এলাকায় ১৫৪টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক স্থানে গেটম্যান বা বেরিয়ার নেই। তিনি জানান, ৮৭টি ক্রসিং অনুমোদনহীনভাবে তৈরি হয়েছে। এগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে স্থানীয়রা আবার খুলে ফেলেন। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রেল দুর্ঘটনার সবগুলোই লেভেলক্রসিংকেন্দ্রিক নয়। রেলপথের বিভিন্ন স্থানে মানুষের অসতর্কতা ও অনিয়মের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। কালিকাপুর রেলব্রিজের নিরাপত্তা নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রাজবাড়ীতে রেল দুর্ঘটনা কমাতে হলে একাধিক বিষয়ে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। অনুমোদনহীন লেভেলক্রসিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি বৈধ কিন্তু অরক্ষিত ক্রসিংগুলোতে গেটম্যান ও বেরিয়ার স্থাপন জরুরি। একই সঙ্গে বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা না থাকলে বন্ধ করা পথ আবার চালু হওয়ার প্রবণতাও ঠেকানো কঠিন হবে।
রেললাইন দিয়ে চলাচলের সময় সাধারণ মানুষের সতর্কতা বাড়ানো, ট্রেনের ছাদে যাতায়াপ বন্ধে কার্যকর নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিয়মিত প্রচার চালানোও প্রয়োজন। নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি ও মানুষের অসচেতনতা—দুই দিকেই নজর দেওয়া গেলে রাজবাড়ীর রেলপথে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।


