খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ২:১ পিএম
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে পাওনা টাকা ফেরত না দেওয়াকে কেন্দ্র করে সাবেক স্ত্রীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করানোর অভিযোগে স্থানীয় এক জামায়াত কর্মীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। অভিযুক্ত আসামির নাম আবু বক্কর সিদ্দিক, যিনি কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর রুকন ছিলেন। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে জামিন প্রার্থনা করতে গেলে বিচারক তাঁর আবেদন নাকচ করে তাঁকে জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলা সূত্রে জানা যায়, সাবেক স্ত্রী সালেহা বেগম হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মূল অভিযুক্ত ও পরিকল্পনাকারী আবু বক্কর সিদ্দিক পলাতক ছিলেন। সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন জানান তিনি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আমজাদ হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জঘন্য এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী আবু বক্কর জামিনের জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাদেকুর রহমান মামলার সার্বিক গুরুত্ব ও অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন এবং তাঁকে সোজা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা (বর্তমানে নেত্রকোনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মো. কামরুল হাসান এবং স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্যে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ উন্মোচিত হয়:
গোপন বিবাহ ও অবস্থান: আবু বক্কর সিদ্দিক পূর্ব চর মার্টিনের বালির পোল এলাকায় সালেহা বেগমের বাড়িতে গৃহশিক্ষক হিসেবে তাঁর সন্তানদের পড়াতেন। সালেহার আগের স্বামী মারা যাওয়ার পর পরিবারের অজান্তে আবু বক্কর তাঁকে বিয়ে করেন। তবে চর কালকিনিতে তাঁর আগের স্ত্রী ও সন্তানরা বহাল তবিয়তেই ছিল।
অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণা: বিয়ের পর জমি কেনার কথা বলে সালেহা বেগমের কাছ থেকে মোট ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন আবু বক্কর। তবে জমি না কিনে তিনি সালেহাকে তালাক দেন এবং যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ করে কেটে পড়েন।
হত্যার ব্লু-প্রিন্ট: পরবর্তীতে পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য সালেহা বেগম চাপ সৃষ্টি করলে আবু বক্কর তাঁকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এজন্য তিনি মো. সেলিম নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মাত্র ৫০ হাজার টাকায় সাবেক স্ত্রীকে হত্যার চুক্তি করেন।
২০২৩ সালের ১৫ জুন সালেহা বেগমকে হত্যা করা হয় এবং পরদিন ১৬ জুন কমলনগর উপজেলার মতিরহাট-সংলগ্ন মেঘনা নদীর তীর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় নিহত সালেহার মেয়ে ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কমলনগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশি তদন্তে ওই বছরের জুলাই মাসে মো. সেলিম নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সেলিম ঘটনার রোমহর্ষক বিবরণ দেন:
চুক্তি অনুযায়ী সেলিম কৌশলে সালেহা বেগমকে নির্জন এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে ধর্ষণের পর তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। হত্যার পর সালেহার কাছে থাকা স্বর্ণালংকার নিয়ে সাভারে পালিয়ে যান এবং সেগুলো বিক্রি করে দেন সেলিম।
দীর্ঘ পুলিশি তদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন, যেখানে আবু বক্কর সিদ্দিককে প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি এ আর হাফিজ উল্যাহ জানান, আবু বক্কর একসময় রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর কোনো পদে বা সংগঠনে নেই। এই ধরনের জঘন্য হত্যাকাণ্ডে তাঁর নাম আসা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মন্তব্য