খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৩৮ পিএম
বাংলার কৃষক-শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, নারীর মুক্তি এবং শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন বিপ্লবী নেত্রী অপর্ণা পাল চৌধুরী। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, সাম্যবাদী রাজনীতি এবং নানকার কৃষক বিদ্রোহ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সাহস, ত্যাগ ও আদর্শের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
১৯২২ সালে সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন অপর্ণা পাল চৌধুরী। ছাত্রজীবনেই তিনি বিপ্লবী রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪০ সালের ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং ছাত্র বিভাগের সম্পাদিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের নারীদের সংগঠিত করে মহিলা সমিতি গড়ে তোলার কাজে নিজেকে নিবেদিত করেন।
১৯৪২ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে সামন্তবাদী শোষণের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বিয়ানীবাজারের শানেশ্বর অঞ্চল ছিল এই আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল, আর অপর্ণা পাল চৌধুরী ছিলেন সেই সংগ্রামের অগ্রসৈনিক।
নানকার আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকার নির্মম দমন-পীড়ন চালায়। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট রাইফেলধারী পুলিশের গুলিতে ছয়জন কৃষক শহীদ হন। সেই সময় অন্তঃসত্ত্বা অপর্ণা পাল চৌধুরী পুলিশের নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হন; নির্যাতনের ফলে তাঁর গর্ভপাত ঘটে এবং আজীবনের জন্য তিনি শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এরপর তাঁকে গ্রেপ্তার করে শ্রীহট্ট, রাজশাহী ও ঢাকা কারাগারে প্রায় পাঁচ বছর অমানবিক বন্দিজীবন কাটাতে হয়।
১৯৫৪ সালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কারামুক্ত হয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। ১৯৬৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হলে স্বামী সুরথ পাল চৌধুরীর সঙ্গে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-তে যোগ দেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন নারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে শিক্ষকতা, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং প্রগতিশীল রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘নারী আন্দোলন: স্মৃতিকথা’ নারীমুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে এক মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত।
১৯৯২ সালের ৬ আগস্ট সংগ্রামী এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর ত্যাগ, সাহস, সংগ্রাম ও সাম্যের স্বপ্ন আজও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অনুপ্রেরণার দীপশিখা হয়ে জ্বলছে।
সাম্যের বাণীবাহক অপর্ণা পাল চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম।
মন্তব্য