খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৪৩ পিএম
রাজধানীর পান্থপথের হোটেল অলিও ইন্টারন্যাশনালে ২০১৭ সালে পরিচালিত আলোচিত জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মামলা থেকে সম্প্রতি খালাস পাওয়া নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’ নতুন করে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এসেছেন। সাভারে বিপুল পরিমাণ পাইপ বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির বিপুল সরঞ্জামসহ এক যুবককে গ্রেপ্তারের পর তার সঙ্গে মামুনের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে এনেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
পুলিশ জানায়, সাভার থেকে মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়া মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে ‘বোমারু মামুনের’ ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও শিষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাভারের শ্যামপুরের একটি বাড়িতে মঙ্গলবার রাত থেকে পৌনে ২টা পর্যন্ত অভিযান চালায় সিটিটিসি। পরে বুধবার সকালে সাভারের গোপেরবাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের সামনের একটি মাঠে পরিত্যক্ত অবস্থায় ড্রামের ভেতরে রাখা আরেকটি ‘প্রেশার কুকার’ বোমার সন্ধান মেলে, যা পরে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ৫ আগস্ট শ্যামপুরের ওই বাড়িটির একটি কক্ষ ভাড়া নেন আরিফ। বাড়ির মালিকের কাছে তিনি নিজেকে ‘আব্বাস আলী’ নামে পরিচয় দিয়ে গাড়িচালক হিসেবে নিজের পরিচয় দেন। দিনের বেলা খুব একটা বাইরে বের না হয়ে গভীর রাতে নানা ধরনের মালামাল ও সরঞ্জাম ওই কক্ষে নিয়ে আসতেন তিনি। সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া পাইপ বোমা ও রাসায়নিক দিয়ে মূলত বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রস্তুতি চলছিল বলে ধারণা গোয়েন্দাদের।
সিটিটিসির এডিসি (ইনভেস্টিগেশন) মাঈন উদ্দীন চৌধুরী জানান, সাভারে গ্রেপ্তার আরিফের দলনেতা বা ‘গুরু’ হলেন নাজমুল হাসান মামুন ওরফে বোমারু মামুন। রাজধানী ও তার আশপাশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনার নেপথ্যে এই দুইজনের স্পষ্ট হাত রয়েছে বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন।
গোয়েন্দাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময়ে ঘটে যাওয়া আকস্মিক বিস্ফোরণ, ফেব্রুয়ারি মাসে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশি তল্লাশির মুখে বোমার ব্যাগ ফেলে পালানো এবং মার্চে কুমিল্লার একটি মন্দির ও সায়েদাবাদে পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে বিস্ফোরণের ঘটনায় তারা যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও গত জুলাই মাসে মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে উল্টো রথযাত্রার পথে ছাতার ভেতরে ‘পাইপ বোমা’ রেখে যাওয়া এবং আশুলিয়ার চারাবাগের এক চায়ের দোকানে ‘প্রেশার কুকার’ বোমা রেখে আসার পরিকল্পনাতেও মামুন ও আরিফের নাম এসেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট পান্থপথের হোটেল অলিওতে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানের সময় সাইফুল ইসলাম নামের এক যুবক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিহত হন। এ ঘটনায় কলাবাগান থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় নব্য জেএমবির তথাকথিত ‘শুরা সদস্য’ হিসেবে ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলাটিতে থাকা ১১ আসামির সঙ্গেই মামুনকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন। আদালতের রায়ে মামলাটিকে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মামলা হিসেবে উল্লেখ করে আসামিদের রেহাই দেওয়া হয়েছিল।
আদালত থেকে খালাস পাওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ফের একের পর এক বোমা তৈরি ও সরবরাহের পেছনে মামুনের নাম উঠে আসায় কপালে চিন্তার ভাজ ফেলছে তদন্তকারীদের। সিটিটিসির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক নিশ্চিত করেছেন, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নাশকতা ও বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোর নিখুঁত তদন্ত চলছে। এই চক্রের মূল হোতা বোমারু মামুনকে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম মাঠে রয়েছে।
মন্তব্য