খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ৫:৩০ পিএম
কণ্ঠে ছিল আধ্যাত্মিকতার আবেশ, সুরে ছিল আত্মার আর্তি—আর সেই সুরের মায়াজালে তিনি জয় করেছিলেন পৃথিবীর কোটি মানুষের হৃদয়।
তিনি নুসরাত ফতেহ আলী খান—কাওয়ালির কিংবদন্তি, সুফি সঙ্গীতের বিশ্বদূত এবং উপমহাদেশের সংগীতভুবনের এক অনন্য বিস্ময়।
নুসরাত ফতেহ আলী খান পাকিস্তানের কিংবদন্তিতুল্য সংগীতশিল্পী। বিশেষ করে সুফিবাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ কাওয়ালিকে তিনি শুধু উপমহাদেশের সীমানায় আবদ্ধ রাখেননি; তাঁর অসাধারণ কণ্ঠ, অনন্য পরিবেশনশৈলী ও সুরের শক্তিতে কাওয়ালি পৌঁছে যায় বিশ্বসংগীতের মঞ্চে।
১৯৪৮ সালের ১৩ অক্টোবর তৎকালীন পাকিস্তানের লায়ালপুর—বর্তমান ফয়সালাবাদে—এক পাঞ্জাবি মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা ফতেহ আলী খান ছিলেন খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ, গায়ক, বাদক ও কাওয়াল। তাঁদের পরিবারে প্রায় ছয়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাওয়ালি পরিবেশনের ঐতিহ্য চলে আসছিল। সেই দীর্ঘ সংগীত-পরম্পরার উত্তরাধিকার তিনি শুধু বহনই করেননি, বরং তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন।
পিতার মৃত্যুর পর অল্প বয়সেই তিনি পরিবারের কাওয়ালি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তাঁর কণ্ঠ ও পরিবেশনার স্বকীয়তা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। তাঁর কণ্ঠ ছিল বিস্ময়করভাবে শক্তিশালী, গভীর ও আবেগময়। একই সঙ্গে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে কাওয়ালি পরিবেশন করতে পারতেন। তাঁর কণ্ঠে কখনো প্রার্থনার আকুলতা, কখনো প্রেমের ব্যাকুলতা, আবার কখনো আত্মার সঙ্গে স্রষ্টার মিলনের আকাঙ্ক্ষা যেন একাকার হয়ে যেত।
তাঁর কাওয়ালির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আলাপ, তান, তাল, তালি ও সমবেত কণ্ঠের ক্রমবর্ধমান আবেগ—যা শ্রোতাকে ধীরে ধীরে এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহের মধ্যে নিয়ে যেত। তাঁর পরিবেশনা শুধু গান শোনা ছিল না; অনেকের কাছে তা ছিল এক ধরনের আত্মিক অভিজ্ঞতা।
নুসরাত ফতেহ আলী খানকে বলা হয় ‘শাহেনশাহ-এ-কাওয়ালি’—অর্থাৎ কাওয়ালির রাজাদের রাজা। তাঁর কণ্ঠের ব্যাপ্তি, স্বতঃস্ফূর্ততা ও দীর্ঘক্ষণ গাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য তাঁকে রেকর্ডকৃত কণ্ঠের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্বসংগীতের সঙ্গে তাঁর সংযোগ আরও বিস্তৃত হয় পশ্চিমা শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে। তিনি বিখ্যাত সংগীতশিল্পী পিটার গ্যাব্রিয়েল-এর সঙ্গে কাজ করেন এবং তাঁর সংগীত পশ্চিমা শ্রোতাদের কাছেও ব্যাপক পরিচিতি পায়। চলচ্চিত্রের সংগীতেও তাঁর কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে তাঁর কাওয়ালি নতুন প্রজন্মের বহু সংগীতশিল্পীকে অনুপ্রাণিত করে।
তাঁর জনপ্রিয় কাওয়ালির মধ্যে ‘তুমে দিল্লাগি’, ‘আফরিন আফরিন’, ‘আল্লাহু’, ‘মেরা পিয়া ঘর আয়া’, ‘ইয়ে জো হালকা হালকা সুরুর হ্যায়’, ‘আখিয়ান উডিক দিয়ান’ সহ অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অমলিন। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া সুফি কবিতাগুলো ভাষার সীমা অতিক্রম করে অনুভূতির এক সার্বজনীন ভাষায় পরিণত হয়েছে।
সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৬ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে প্রাইড অব পারফরম্যান্স পুরস্কারে ভূষিত করে। দেশ-বিদেশে তিনি অর্জন করেন বহু সম্মাননা ও স্বীকৃতি। তাঁর কণ্ঠ ও সৃষ্টিশীলতা পরবর্তীকালে অসংখ্য কাওয়ালি ও বিশ্বসংগীতশিল্পীর জন্য হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার উৎস।
কিন্তু কিংবদন্তির জীবনও ছিল অতি স্বল্পায়ু। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে, ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট, লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে।
তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থেমে যায়নি।
আজও যখন তাঁর কণ্ঠে ভেসে আসে—
‘আল্লাহু… আল্লাহু…’
তখন মনে হয়, কোনো এক অদৃশ্য দরজা খুলে যাচ্ছে আত্মার গভীরে; সুরের ভেতর দিয়ে মানুষ যেন নিজের কাছেই ফিরে যাচ্ছে।
নুসরাত ফতেহ আলী খান শুধু একজন কাওয়াল ছিলেন না; তিনি ছিলেন কাওয়ালির এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। ছয় শতাব্দীর ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কাওয়ালিকে মসজিদ, দরগাহ ও মেহফিলের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন পৃথিবীর বড় বড় সংগীতমঞ্চে।
সুরের শরীর মরে যায়, কিন্তু সুরের আত্মা মরে না।
তাই মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও নুসরাত ফতেহ আলী খানের কণ্ঠ বিশ্বজুড়ে বেজে চলে—অমর, অনন্ত, অবিনশ্বর।
কাওয়ালি সম্রাট, সুফি সঙ্গীতের বিশ্বদূত নুসরাত ফতেহ আলী খানের ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য