রাজধানীর অন্যতম অভিজাত এলাকা গুলশান-২-এর ৫৫ নম্বর সড়কে অবস্থিত ঢাকা ওয়াসার ১১৪ কাঠা মূল্যবান জমি যৌথ উদ্যোগে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য একটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অত্যন্ত মূল্যবান ও সবুজ গাছগাছালিতে ঘেরা এই সরকারি জমিটি অর্পণ করা নিয়ে ওয়াসার ভেতরের ও বাইরের বিভিন্ন মহলে চরম প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং অযাচিত আগ্রহ দেখিয়ে বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য জমিটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সরকারি জমি বেসরকারি ডেভেলপার সংস্থাকে হস্তান্তরের পেছনে বিশেষ কোনো স্বার্থ কাজ করছে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।
প্রাইম লোকেশনের কোটি টাকার সম্পদ
গুলশান লেকের পাড়ে অবস্থিত ঢাকা ওয়াসার এ জমিটির আর্থিক ও কৌশলগত মূল্য অপরিসীম। বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) রাজউকের মাধ্যমে ঢাকা ওয়াসাকে এই জমিটি বরাদ্দ দেয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে রাজউকের সঙ্গে ওয়াসার আনুষ্ঠানিকভাবে ৯৯ বছরের একটি ইজারা চুক্তি হয়। ১৯৬৪ সাল থেকে কার্যকর ধরে নেওয়া ওই চুক্তিতে পরিষ্কার শর্ত দেওয়া ছিল, জমিটিতে আবাসনের ব্যবস্থা করা হলেও রাজউকের নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ ও আইন মেনে চলতে হবে।
বর্তমান বাজারদরে আবাসন ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, গুলশানে প্রতি কাঠা জমির গড় দাম প্রায় ১০ কোটি টাকা। ফলে ওয়াসার এ জমির বাজারমূল্য কমপক্ষে ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। সীমানাপ্রাচীরে ঘেরা এই জমির ভেতরে বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একটি ডাকবাংলো, ওয়াসার কর্মকর্তাদের বাসভবন এবং প্রচুর ফলজ ও বনজ গাছগাছালি রয়েছে।
যৌথ উদ্যোগের বিতর্কিত প্রস্তাব
চলতি বছরের ৬ জুন ‘এশিউর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন’ নামের একটি বেসরকারি আবাসন কোম্পানি ওয়াসার কাছে জমিটিতে যৌথভাবে ১৯ তলাবিশিষ্ট ‘আইকন ক্যাটাগরির’ বিলাস বহুল আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাব জমা দেয়। ওই আবাসন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. শেখ সাদী রাজনৈতিকভাবে পরিচিত মুখ। তিনি কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৪ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
কোম্পানিটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পুরো জমিতে দেড় শতাধিক ফ্ল্যাট তৈরি করা হবে, যেখানে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে প্রায় ৪,৭০০ বর্গফুট। নির্মাণের সব ব্যয় বহন করবে আবাসন প্রতিষ্ঠানটি এবং নির্মাণকাজ শেষে ভবন ও ফ্ল্যাটের ৫১ শতাংশ পাবে ঢাকা ওয়াসা আর বাকি ৪৯ শতাংশ চলে যাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়। এ ধরনের বিলাস বহুল ফ্ল্যাটের বাজারদর প্রতি বর্গফুটে প্রায় ২৫ হাজার টাকা ধরলে একেকটি ফ্ল্যাটের আনুমানিক মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে দেড় শ ফ্ল্যাটের মোট আনুমানিক মূল্য প্রায় ১,৭৬৩ কোটি টাকা, অথচ ৪ শত কোটি টাকার মতো ব্যয়ে নির্মিত ভবনের প্রায় অর্ধেক মালিকানা চলে যাবে ওই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে।
ওয়াসার সিদ্ধান্ত ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ
প্রস্তাবটি পাওয়ার পর ঢাকা ওয়াসা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে গত ১৬ জুলাই এটি পর্যালোচনায় একটি তিন সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে। কমিটিকে চুক্তি সংক্রান্ত আইনি দিক, অর্থ লাভ-ক্ষতি এবং সুবিধা-অসুবিধা খতিয়ে দেখতে বলা হয়।
সম্প্রতি ওয়াসার নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. সাব্বির মোস্তফা খান ও কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রস্তাবটি পাস করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে বৈঠকের বেশ কয়েকজন সদস্য এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করায় তা তাৎক্ষণিকভাবে পাস করা সম্ভব হয়নি।
সংস্থার কিছু কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একটি সুনির্দিষ্ট প্রভাবশালী চক্রের নজর পড়েছে ওয়াসার এ জমির ওপর এবং তারাই দ্রুততার সঙ্গে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, কোনো অশুভ চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে পুরোপুরি সংস্থার স্বার্থ নিশ্চিত করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অপ্রাসঙ্গিক ফ্ল্যাট সাইজ ও নগর বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব অনুযায়ী, ওয়াসা যদি তাদের হিস্যা হিসাব করে ৭৭টি ফ্ল্যাট পায়, তবে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আকার হবে ৪,৭০০ বর্গফুট। এ নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যেই বড় ধরনের হাসাহাসি ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, রাজধানীর বেইলি রোডে মন্ত্রীপর্যায়ের সরকারি আবাসনে একেকটি ফ্ল্যাট ৫,০০০ বর্গফুট এবং ইস্কাটনে সচিবদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটের আয়তন প্রায় ৩,৫০০ বর্গফুট। ঢাকা ওয়াসার কোনো কর্মকর্তা আইনগত প্রাধিকার অনুযায়ী এত বড় আকারের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট পাওয়ার যোগ্য নন। ফলে সরকারি সম্পদ দিয়ে কেন এমন প্রকাণ্ড ফ্ল্যাট তৈরি করা হবে এবং তা ওয়াসার কী কাজে আসবে, সে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মিলেনি।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল-পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান অত্যন্ত কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গুলশানের মতো জনবহুল ও প্রিমিয়াম এলাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের বড়, খোলামেলা ও সবুজ একটি খণ্ড জমি কোনো বাণিজ্যিক বহুতল আবাসন প্রকল্পের জন্য লিখে দেওয়া বা বিবেচনায় নেওয়াটাই ঘোরতর অনিয়ম। সরকারি সম্পদ কাউকে ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার মাধ্যম হতে পারে না। এর পেছনে কারা যুক্ত রয়েছে এবং কার কী ব্যক্তিগত স্বার্থ রয়েছে, তা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনা প্রয়োজন।
এদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়েছেন, ওয়াসার ইজারা চুক্তিতে শর্ত ভঙ্গ ও হস্তান্তরের ওপর নানা আইনি কড়াকড়ি রয়েছে। শর্ত লঙ্ঘন করে জমি ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না বলে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন।

