খুলনা মহানগরী ও আশপাশের জেলাগুলোতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন আশঙ্কাজনক রূপ নিচ্ছে। গত এক সপ্তাহে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। নগরীতে ভাইরাসের দ্রুত বিস্তার ঠেকাতে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) ৩১টি ওয়ার্ডের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ৪টি ওয়ার্ডকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে বাড়তে থাকায় স্থান সংকুলান না হয়ে বারান্দা ও মেঝেতে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, খুলনা সিটি করপোরেশনের তৈরি পরিসংখ্যানে নগরীর ৩০, ২৯, ২৮ ও ২২ নম্বর—এই চারটি ওয়ার্ডে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় সেগুলোকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু এই চার ওয়ার্ডেই চলতি মৌসুমে রেকর্ড ২৮৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ ১১১ জন এবং ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে ১০০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৮০ জন এবং ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ৭৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়।
অন্যদিকে ১৭, ১৮, ২৩, ২৪ ও ২৭ নম্বর—এই পাঁচ ওয়ার্ডকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘কমলা জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে আক্রান্তের মোট সংখ্যা ২৬৮ জন। এছাড়া কম ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘হলুদ জোনে’ থাকা ১৫, ২০, ২৫ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে এখন পর্যন্ত ১১৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে পাওয়া তথ্য ও খুলনা বিভাগের সাম্প্রতিক ডেঙ্গু পরিস্থিতির চিত্র নিচে উপস্থাপন করা হলো:
| ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যানের বিবরণ | তথ্য/সংখ্যা |
| বিভাগে চলতি বছরে মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগী | ৩,৮২৩ জন |
| চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পাওয়া রোগী | ৩,২৬৭ জন |
| বিভাগে বর্তমানে চিকিৎসাধীন মোট ডেঙ্গু রোগী | ৫০২ জন |
| উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তরিত রোগী | ৩৯ জন |
| গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে নতুন ভর্তি রোগী | ১৩৩ জন |
| গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু খুলনায় ভর্তি রোগী | ১০৩ জন |
| খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগী | ১২৩ জন |
| জেলায় সব মিলিয়ে মোট ভর্তি রোগী | ৩৪৪ জন |
| খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা | ১৫ জন |
| শুধু খুলনা জেলায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা | ১৪ জন |
| বাগেরহাট জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা | ১ জন |
আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, কেসিসির মাঠপর্যায়ের মশকনিধন কর্মসূচি খুব একটা কাজে আসছে না। তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ড্রেন পরিচ্ছন্নতা এবং মাইকিং ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতি বিচারে কেসিসির সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ মো. মোশারফ হোসেন জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে সুস্থতার হার ভালো হলেও গত কয়েক দিনে নতুন রোগী ভর্তির চাপ অনেক বেড়ে গেছে। খুমেক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যা না থাকায় রোগীদের হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে, যা চিকিৎসকদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং।
কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শরীফ শাম্মীউল ইসলাম জানান, বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তথ্যের ভিত্তিতেই এই জোনভিত্তিক তালিকা করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০টি করে ফগার ও হ্যান্ড স্প্রে এবং উন্মুক্ত স্থানের জন্য হুইল ব্যারো ফগার দিয়ে স্প্রে জোরদার করা হয়েছে।
কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা অনুযায়ী আগামী আরও দুই-তিন মাস ডেঙ্গুর প্রভাব থাকতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে খুমেক ও জেনারেল হাসপাতালসহ প্রধান কেন্দ্রগুলোতে কেসিসির স্পেশাল মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে।

