ডারউইন জয়ের পর ক্যারিয়ারসেরা র‍্যাঙ্কিংয়ে শান্ত

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর এবার আইসিসির র‍্যাঙ্কিংয়েও বড় সুখবর পেলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। ডারউইনে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারানোর পর প্রকাশিত সর্বশেষ টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে ব্যাটারদের তালিকায় নয় ধাপ এগিয়ে ক্যারিয়ারের সেরা অবস্থান নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ৬৫৯ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে তিনি উঠে এসেছেন ২০তম স্থানে, প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছেন শীর্ষ ২০-এ।

ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের জয়ে শান্তর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ইনিংসে ৮৪ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে তিনি দলের বড় সংগ্রহ গড়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৪২৬ রান করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২২৮ রানের বিশাল লিড নেয়। সেই ম্যাচের পারফরম্যান্সই শান্তকে র‍্যাঙ্কিংয়ে বড় লাফ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ৬৫৯ পয়েন্ট নিয়ে তিনি পেছনে ফেলেছেন ভারতের রবীন্দ্র জাদেজা ও বাংলাদেশের লিটন দাসকে। বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে এটি শান্তর অন্যতম সেরা রেটিং।

বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যেও সবচেয়ে বড় উন্নতি করেছেন হাসান মাহমুদ। ডারউইনের প্রথম ইনিংসে মাত্র ৫৫ রান দিয়ে ছয় উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান তিনি। ম্যাচে মোট নয় উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে বড় ভূমিকা রাখার পুরস্কার হিসেবে ২৬ ধাপ এগিয়ে ৩৮তম স্থানে উঠেছেন এই পেসার। তার রেটিং পয়েন্টও প্রথমবারের মতো ৫০০-এর সীমা পেরিয়ে ৫০৩ হয়েছে। ম্যাচসেরা হওয়ার পাশাপাশি র‍্যাঙ্কিংয়েও হাসানের এই অগ্রগতি বাংলাদেশের পেস আক্রমণের সাম্প্রতিক উন্নতির প্রতিফলন।

মেহেদী হাসান মিরাজও বোলিং র‍্যাঙ্কিংয়ে তিন ধাপ এগিয়ে ২৪তম অবস্থানে উঠেছেন। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৬ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। তার অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ মাত্র ২৮৪ রানে অস্ট্রেলিয়াকে গুটিয়ে দিতে সক্ষম হয়। অলরাউন্ডারদের তালিকায় অবশ্য মিরাজের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে—তিনি তিন নম্বরেই আছেন। তবে তার রেটিং বেড়ে হয়েছে ৩২০। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন ভারতের রবীন্দ্র জাদেজা।

ব্যাটিং র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চমক তানজিদ হাসান তামিম। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ১০১ রানের দুর্দান্ত শতক করে তিনি ৮৪ ধাপ এগিয়ে যৌথভাবে ৮৮তম স্থানে উঠে এসেছেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট শতকও এটি। মাত্র দুই টেস্টের ক্যারিয়ারেই এমন অর্জন তানজিদকে দেশের ক্রিকেটে নতুন আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা মুশফিকুর রহিম ১৮তম স্থান ধরে রেখেছেন। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজের প্রথম টেস্টে এক ইনিংসে ৩৬ রান করলেও র‍্যাঙ্কিংয়ে তার অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। লিটন দাস পাঁচ ধাপ পিছিয়ে ২৮তম স্থানে নেমেছেন। মুমিনুল হক পাঁচ ধাপ এগিয়ে ৩১তম, সাদমান ইসলাম তিন ধাপ এগিয়ে ৫৮তম এবং মেহেদী হাসান মিরাজ পাঁচ ধাপ এগিয়ে ৫৯তম অবস্থানে রয়েছেন।

বোলারদের তালিকায় তাইজুল ইসলাম ১১তম অবস্থান ধরে রেখেছেন। ডারউইন টেস্টে একটি উইকেট পেলেও তার র‍্যাঙ্কিংয়ে কোনো অবনতি হয়নি। তাসকিন আহমেদ তিন উইকেট নিয়ে এক ধাপ উন্নতি করে ৪৯তম স্থানে উঠেছেন। অন্যদিকে, এই টেস্টের স্কোয়াডে না থাকা নাহিদ রানা এক ধাপ পিছিয়ে ৬০তম অবস্থানে নেমেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের মধ্যেও ডারউইনের ফলাফলের প্রভাব পড়েছে। দুই ইনিংসে মাত্র ২২ ও ১৭ রান করা ট্র্যাভিস হেড টেস্ট ব্যাটারদের শীর্ষস্থান হারিয়েছেন। তাকে সরিয়ে আবারও এক নম্বরে উঠেছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি ব্রুক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবার শীর্ষে ওঠার পর এবার চতুর্থবারের মতো এই অবস্থান ফিরে পেলেন তিনি। জো রুটও হেডকে পেছনে ফেলে ওপরে উঠেছেন। ডারউইন টেস্টে ৭১ ও ৪৪ রান করা স্টিভ স্মিথ রয়েছেন তৃতীয় স্থানে।

অস্ট্রেলিয়ার আরেক ব্যাটার ক্যামেরন গ্রিন অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি করেছেন। দ্বিতীয় ইনিংসে দুর্দান্ত শতক করে পাঁচ ধাপ এগিয়ে ৩০তম স্থানে উঠেছেন। তবে তার শতকও অস্ট্রেলিয়াকে হার থেকে বাঁচাতে পারেনি। গ্রিনের ইনিংসের পরও মিরাজ ও হাসান মাহমুদের বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়া ২৮৪ রানে অলআউট হয় এবং বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায়।

ডারউইনের জয় শুধু র‍্যাঙ্কিংয়ের হিসাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় এবং দুই ম্যাচের সিরিজে দল ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে। একই সঙ্গে এই জয়ের ফলে চলমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকাতেও বাংলাদেশ চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে, যেখানে তাদের পয়েন্ট শতাংশ ৬৬.৬৭।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, ডারউইনের জয় কোনো একক ক্রিকেটারের ওপর নির্ভর করে আসেনি। হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত পেস, মিরাজের নিয়ন্ত্রিত স্পিন, তানজিদের শতক, শান্তর দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং দলের নিচের সারির লড়াই—সব মিলিয়েই এসেছে এই সাফল্য। ফলে র‍্যাঙ্কিংয়ে ব্যক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি দলের আত্মবিশ্বাসও এখন অনেক উঁচুতে। সামনে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

Tags :

Shakib

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর