এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলা সংগীতের ভুবনে “লালন” এবং “ফরিদা পারভীন”—এই দুটি নাম যেন একই সুতোয় বাঁধা।
বাঙালির অন্তর, মনের গভীরতম কোণে লালন সাঁইজির গান যখনই বাজে, তখনই প্রতিধ্বনিত হয় ফরিদা পারভীনের আধ্যাত্মিক কণ্ঠ। তাঁর গলায় লালনগীতি হয়ে ওঠে প্রাণস্পর্শী, হয়ে ওঠে আত্মার আর্তি, মাটির টান, মানুষের বোধজাগরণ।
তাঁর জন্ম ও শৈশব বেড়ে উঠা আর দশটি বাঙালী নারীর মতই খুবই সাধারন।
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া থানার শাঔঁল গ্রামে জন্ম নেন ফরিদা পারভীন। শৈশবে ছিলেন চঞ্চল ও প্রাণবন্ত—দৌড়ঝাঁপ, বিলের শাপলা তোলা, নদীতে ডিঙি নৌকা ভাসানো, মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে মাঠ-ঘাটে খেলাধুলায় ভরা ছিল তাঁর দিন। অথচ সেই খেলাধুলার মাঝেই গান হয়ে উঠেছিল তাঁর সঙ্গী। ছোটবেলা থেকেই রেডিওর আধুনিক গান, বিশেষত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ তাঁকে মুগ্ধ করত। শব্দের টান ও উচ্চারণের শুদ্ধতা তাঁর মধ্যে শৈশবেই গড়ে ওঠে।
শিক্ষা ও গানের হাতেখড়ি শুরু হয় মাগুরায়। বাবার চাকরির বদলির কারণে কুষ্টিয়া, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন শহরে কাটাতে হয় তাঁর শৈশব-কৈশোর। পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীতের শিক্ষা নিয়েছেন একাধিক ওস্তাদের কাছে। চার-পাঁচ বছর বয়সে ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে গানের হাতেখড়ি। পরে কুষ্টিয়ার ওস্তাদ ইব্রাহিম, রবীন্দ্রনাথ রায়, মোতালেব বিশ্বাস, ওসমান গণি—সবার কাছেই তিনি নিয়মিত তালিম নেন। প্রথমে ক্ল্যাসিক্যাল, পরে নজরুলসংগীত, আর শেষে তিনি আবিষ্কার করেন তাঁর জীবনের প্রকৃত দিশা—লালনগীতি।
১৯৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বেতারে তালিকাভুক্ত শিল্পী হন। ১৯৭৩ সালে গুরু মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে ‘সত্য বল সুপথে চল’ গান শিখে তাঁর লালনগীতি সাধনার যাত্রা শুরু হয়। পরে খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, ইয়াছিন সাঁইসহ লালনের বহু সাধকের কাছে তালিম নেন তিনি।
ফরিদা পারভীনেরকর্মজীবন ও শিল্পীজীবন গানের ভুবন শুধু লালনেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সমান দক্ষতায় গেয়েছেন নজরুলসংগীত, দেশাত্মবোধক গান ও আধুনিক গান।
স্বাধীনতার পর তাঁর গাওয়া “এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা-সুরমা নদীর তটে” গানটি হয়ে ওঠে জাতীয় আবেগের প্রতীক।
আধুনিক গানে “তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম” এবং চলচ্চিত্র “অন্ধ প্রেম”-এ ব্যবহৃত “নিন্দার কাঁটা” আজও স্মরণীয়।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাঁর পরিচয়—লালনশিল্পী। তাঁর কণ্ঠে “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি”, “বাড়ির কাছে আরশিনগর” কিংবা “সময় গেলে সাধন হবে না” শুধু গান নয়, হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
পারিবারিক জীবনে
ফরিদা পারভীন প্রখ্যাত গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী আবু জাফরের সহধর্মিণী। তাঁদের এক মেয়ে—জিহান ফারিয়া এবং তিন ছেলে—ইমাম নিমেরি উপল, ইমাম নাহিল সুমন ও ইমাম নোমানি রাব্বি।
গানে সাথে নিয়ে বিশ্বভ্রমণ ও অবদান রেখেছেন উল্লেখ করার মত।
বাংলাদেশ ছাড়িয়ে তিনি লালনগীতি পৌঁছে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ইংল্যান্ড—অসংখ্য দেশে তাঁর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে লালনের বাণী। ফলে লালনশিল্প শুধু গ্রামীণ আঙিনা পেরিয়ে বিশ্বসঙ্গীতের অঙ্গনে জায়গা করে নিয়েছে।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন গর্ব করার মত।
একুশে পদক (১৯৮৭) – লালনগীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩) – অন্ধ প্রেম ছবির “নিন্দার কাঁটা” গানের জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী (নারী)
ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার প্রাইজ, জাপান (২০০৮) – লালনের গানকে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বীকৃতি
এ ছাড়া দেশে-বিদেশে অগণিত সংবর্ধনা ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।
সংগীতজীবনের মাইলফলক রয়েছে অসংখ্য সারা জাগানো গান।
ফরিদা পারভীনের অ্যালবামের তালিকায় রয়েছে—
অচিন পাখি (১৯৭৬)
লালনের গান
সময় গেলে সাধন হবে না
আমারে কি রাখবেন গুরু চরণে
হিট সঙস অব ফরিদা পারভীন
লাইভ কনসার্ট ইন জাপান
লাইভ কনসার্ট ইন ফ্রান্স—সহ অসংখ্য রেকর্ড ও প্রকাশনা।
এই মহান শিল্পীর সঙ্গীত জীবনের স্বর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হয়
২০১৯ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে তাঁর সংগীতজীবনের ৫০ বছর পূর্তি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। লালন রিসার্চ অ্যান্ড কালচারাল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে শিল্পী-সাহিত্যিক-গবেষকেরা উপস্থিত থেকে তাঁকে সংবর্ধনা জানান। ফরিদা পারভীন নিজেই উক্ত অনুষ্ঠানে বলেছিলেন-
“আমাকে নিয়ে এর আগে কেউ এমন উদ্যোগ নেয়নি। লালন রিসার্চ অ্যান্ড কালচারাল ফাউন্ডেশন আমাকে মূল্যায়ন করছে—এটি আমার জীবনের বড় পাওয়া।”
সবশেষে তাঁকে নিয়ে নিঃসন্দেহে বলা যায়
ফরিদা পারভীন শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি এক সেতুবন্ধন—যিনি গ্রামীণ আধ্যাত্মিক সাধনা ও নগর সংস্কৃতিকে যুক্ত করেছেন সংগীতের মায়াবী স্রোতে। তাঁর কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান হয়ে উঠেছে বাঙালির আত্মার আর্তি, জীবনের দার্শনিক ব্যাখ্যা। আজ লালনগীতি যদি বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বমানসে স্থান করে নেয়, তবে তার মূলে রয়েছেন ফরিদা পারভীন—বাংলার আধ্যাত্মিক কণ্ঠস্বর।
১৩ ই সেপ্টেম্বর শনিবার রাত ১০.১৫ মিনিটে সারা বিশ্বের ভক্তকুল কে শোক সাগড়ে ভাসিয়ে তিনি পাড়ি জমালেন অচিন দেশে।
আজ তাই কানে বাজে তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় লালন সঙ্গীত “খাঁচার ভিতর অচিন পাখী কমনে আসে যায়.”…
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক “খবরওয়ালা”