এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এমন এক প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে অনুপস্থিতিও এক ধরনের শক্তি, আর দুর্বলতাও হয়ে উঠছে প্রতিদ্বন্দ্বীর সুযোগ। বহু বছর ধরে যে দুই-মেরু বাস্তবতা—আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি—দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র নির্ধারণ করেছে, সেই কাঠামো আজ টালমাটাল। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বা সীমিত উপস্থিতি যে শূন্যতা তৈরি করেছে, সেটি পূরণে কে কতটা প্রস্তুত—এই প্রশ্নই এখন মূল।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে বিএনপির জন্য একটি রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন পর তারা এমন এক মাঠ পেয়েছে, যেখানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দৃশ্যত দুর্বল। কিন্তু সুযোগ সবসময় শক্তি হয়ে ওঠে না—যদি সংগঠন প্রস্তুত না থাকে। বিএনপির ক্ষেত্রে সেটিই বড় প্রশ্ন। মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ বিভাজন, কিছু স্থানে অনিয়ন্ত্রিত চাঁদাবাজির অভিযোগ—এসব জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জনগণ পরিবর্তন চায়, কিন্তু তারা বিশৃঙ্খলা চায় না। পরিবর্তনের নামে যদি পুরনো অনিয়মের ছায়া ফিরে আসে, তাহলে আস্থার সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
তারেক রহমানের বক্তব্য ও কৌশল নিয়েও আলোচনা কম নয়। অনেকেই মনে করেন, তার বক্তব্য কখনো কখনো আবেগনির্ভর ও এলোমেলো হয়ে পড়ে—যেখানে স্পষ্ট নীতিগত রূপরেখার বদলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বেশি দৃশ্যমান। একটি দল যখন দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকে, তখন তাদের প্রয়োজন সুসংগঠিত ভিশন, অর্থনীতি-শাসন-পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। কেবল সরকারবিরোধী বক্তব্য যথেষ্ট নয়; জনগণ জানতে চায়—ক্ষমতায় গেলে কী হবে, কীভাবে হবে, কতটা স্বচ্ছভাবে হবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন পথে হাঁটছে। তারা প্রকাশ্য উত্তেজনার বদলে নীরব সংগঠন বিস্তারে মনোযোগ দিয়েছে। তৃণমূলভিত্তিক নেটওয়ার্ক, সামাজিক কার্যক্রম, ডিজিটাল প্রচার—সব মিলিয়ে একটি সুসংহত কৌশল তারা অনুসরণ করছে বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সহনশীলতা বা অনুকূল পরিবেশ তারা পাচ্ছে—যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে সর্বজনস্বীকৃত প্রমাণ সবসময় স্পষ্ট নয়। তবুও রাজনীতিতে ধারণাই অনেক সময় বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আদর্শিক প্রচার। জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় আবেগ ও পরকালীন প্রতিশ্রুতির ভাষা ব্যবহার করে রাজনীতি করেছে—সমর্থকেরা একে নৈতিক রাজনীতি বলেন, সমালোচকেরা বলেন আবেগনির্ভর প্রলোভন। “বেহেশতের প্রতিশ্রুতি” কিংবা ধর্মীয় অনুপ্রেরণার রাজনৈতিক ব্যবহার—এসব বিষয় নিয়ে সমাজে বিতর্ক আছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান থাকা জরুরি, কিন্তু সেটি যদি ভোটের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—রাষ্ট্র কি নাগরিক অধিকার ও নীতির ভিত্তিতে চলবে, নাকি আবেগের তরঙ্গে?
এই প্রেক্ষাপটে তরুণ ভোটাররা হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। তারা অতীতের ইতিহাসের চেয়ে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা বেশি খোঁজে। কর্মসংস্থান, শিক্ষার মান, প্রযুক্তি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন—এসব তাদের অগ্রাধিকার। যে দল এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর দিতে পারবে, তার দিকেই তারা ঝুঁকবে। আবেগ, স্লোগান বা প্রতিপক্ষবিরোধী বক্তব্য দিয়ে সাময়িক সমর্থন পাওয়া যায়; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আস্থা গড়তে লাগে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা।
বিএনপি যদি নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারে, আর জামায়াত যদি কৌশলগতভাবে নিজেদের শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়—তাহলে রাজনৈতিক অক্ষ পরিবর্তিত হতে পারে। তখন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে। আর যদি আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় সক্রিয় প্রতিযোগিতা থেকে বাইরে থাকে, তবে সেই শূন্যতা স্থায়ী রূপও নিতে পারে।
এই মুহূর্তে প্রশ্ন একটাই—কে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে? শূন্যতার সুযোগ কি দায়িত্বশীল নেতৃত্বে রূপ নেবে, নাকি কৌশল আর আবেগের খেলায় ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে?
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়; এটি চরিত্রের পরীক্ষা। যে দল আত্মসমালোচনা করতে পারবে, সংগঠনকে শুদ্ধ করতে পারবে এবং জনগণের সামনে সৎ ও বাস্তবসম্মত ভবিষ্যৎ তুলে ধরতে পারবে—তার হাতেই যাবে আগামী অধ্যায়ের কলম। অন্যথায় ইতিহাস আবারও প্রমাণ করবে—শূন্যতা কখনোই দীর্ঘদিন শূন্য থাকে না; কেউ না কেউ সেটি পূরণ করেই ফেলে।
সে ক্ষেত্রে বিএমপি যদি নিজ দের ভুলে অক্ষমতার কারনে কোনো কারনে বা চক্রান্তে দলটি ক্মতার বাহিরে ছিটকে পরে, তাহলে পড়া দলটায় অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। পাশাপাশি জামাতের মত একটি মৌলবাদি অপশক্তি জনগনের আষ্টেপৃষ্টে আকরে ধরার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে নানা রকম অপকৌশলে। তখন হয়তে জনগন তাদের হারিয়ে যাওয়া ৭৬ বছবের পুরানা দল, মুক্তিযুদ্ধের দল, জনমানুষের দল আওয়ামীলীগকেই খুঁজে ফেরার চেষ্টা করবে বৈকি।
লেখকঃ
এবিএম জাকিরুল হক টিটন
সম্পাদক ও প্রকাশক
খবরওয়ালা ও জিলাইভ ২৪. কম