ক্রীড়াজগতের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ও আলোচিত স্মারকগুলোর একটি অবশেষে নতুন ঠিকানায় পৌঁছেছে। ১৯৮৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্ব দেখেছিল অসামান্য কিছু মুহূর্ত। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার ডিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং পরবর্তীতে শতাব্দীর সেরা গোলটিতে ব্যবহৃত ফুটবলটি নিলামে বিক্রি হয়েছে ২.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ‘হেরিটেজ অকশন’-এর মাধ্যমে বলটি হাতবদল হয়। ঐতিহ্যবাহী সাদা-কালো শেডের এবং বর্তমানে রঙচটে যাওয়া অ্যাডিডাস অ্যাজটেকা বলটি দেখতে এখন অনেকটাই এবড়ো-থেবড়ো ও খেলার অনুপযুক্ত। কিন্তু ফুটবলের রাজপুত্র ম্যারাডোনার স্মৃতি জড়িয়ে থাকায় এর ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। নিলাম শুরু হওয়ার আগেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, এটি বিশ্ব ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম দামি স্মারক হতে যাচ্ছে। নিলামকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা স্পষ্ট করেই বলেন, এখন পর্যন্ত বিশ্বে টিকে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল স্মারকগুলোর তালিকায় এই বলটি একদম শীর্ষেই থাকবে।
১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। টানটান উত্তেজনার সেই ম্যাচের ৫১ মিনিটে এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন ম্যারাডোনা। ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিল্টনের সঙ্গে শূন্যে লাফিয়ে উঠে তিনি কৌশলে হাত দিয়ে বল জালে ঠেলে দেন। রেফারি ঘটনাটি দেখতে না পাওয়ায় গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়। ম্যাচ শেষে সেই অসামান্য ও বিতর্কিত মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, “গোলটি কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে হয়েছে।” সেই থেকে এই গোলটি ফুটবল বিশ্বে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিতি পায়।
সেই এক ম্যাচেই তৈরি হয়েছিল দুটি ভিন্ন ইতিহাস। হাত দিয়ে বিতর্কিত গোল করার মাত্র চার মিনিট পর ম্যারাডোনা দেখান ফুটবল পায়ে তাঁর ঐশ্বরিক ক্ষমতা। মাঝমাঠ থেকে একাই বল ড্রিবল করে দৌড়ে গিয়ে ইংল্যান্ডের পাঁচজন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করেন তিনি। এরপর চতুরতার সঙ্গে গোলরক্ষক পিটার শিল্টনকেও পেছনে ফেলে বল জালে পাঠান। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয়। পরবর্তীতে ম্যারাডোনার দ্বিতীয় গোলটি বিংশ শতাব্দীর সেরা গোল বা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
ইতিহাস গড়া সেই ফুটবলটি টানা তিন দশক ধরে নিজের কাছে যত্ন করে রেখেছিলেন ম্যাচের প্রধান রেফারি টিউনিশিয়ার আলী বিন নাসের। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের পর থেকে বলটি তাঁর সংগ্রহেই ছিল। ২০২৩ সালে এক বিশেষ চিঠিতে স্বাক্ষর করে তিনি নিজেই নিশ্চিত করেছিলেন যে, ওই ঐতিহাসিক ম্যাচের পুরো ৯০ মিনিট জুড়ে কেবল এই একটি মাত্র বলই ব্যবহার করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে আলী বিন নাসের বলটি প্রথমবার এক সংগ্রাহকের কাছে ১.৭৪ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি করে দেন। নতুন ক্রেতা ২০২৩ সালে এটি পুনরায় নিলামে তোলার উদ্যোগ নিলেও সেবার কাক্সিক্ষত ন্যূনতম দর না ওঠায় বলটি আর হাতবদল হয়নি। তবে এবার হেরিটেজ অকশনে ভালো দাম পেলেও নিলামকারী সংস্থা জানিয়েছে, তাঁদের প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল। তারা অন্তত ৫ মিলিয়ন পাউন্ড বা তার বেশি দর পাওয়ার আশা করেছিলেন।
স্মারকটির গুরুত্ব বুঝতে ম্যারাডোনার সেই ম্যাচের জার্সিটির কথা টানা যায়। ২০২২ সালে আয়োজিত অন্য একটি নিলামে ম্যারাডোনার ওই ঐতিহাসিক ম্যাচে পরা নীল রঙের জার্সিটি বিক্রি হয়েছিল রেকর্ড ৭.১ মিলিয়ন পাউন্ডে। সেই তুলনায় বলের দাম কিছুটা কম হলেও, ফুটবলের ইতিহাসে এই অ্যাডিডাস অ্যাজটেকা বলটির স্থান চিরকাল অনন্য হয়েই থাকবে।


