ভারতের ওড়িশা উপকূলের কাছে বঙ্গোপসাগরে পানামার পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ‘এমভি ওশান উইনার’ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় মো. আবদুল্লাহ আল মামুন নামে এক বাংলাদেশি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নিখোঁজ রয়েছেন। জাহাজটিতে মোট ২৪ জন ক্রু ছিলেন। তাদের মধ্যে ২০ জন চীনের, তিনজন মিয়ানমারের এবং একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে ছিলেন মামুন। দুর্ঘটনার পর এখন পর্যন্ত দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ২২ জনের সন্ধানে ভারতীয় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সমন্বিত উদ্ধার অভিযান চলছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শহরের গণমুখী মাঠসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মামুনের নিখোঁজের খবরে তার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর উদ্বেগ। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনরা বারবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মামুনের মা দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগে ভুগছেন। ছেলের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হয়েছে। মামুনের স্ত্রী ও সন্তানরাও চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
মামুনের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, পরিবারের সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তার ভাষ্য, মায়ের অসুস্থতার কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি সরকারের কাছে দ্রুত ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে মামুনের অবস্থান নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মামুনের ডাকনাম মানিক। তিনি পেশায় একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। প্রায় চার মাস সমুদ্রে দায়িত্ব পালনের পর গত এপ্রিলের শেষ দিকে ‘এমভি ওশান উইনার’ জাহাজে যোগ দেন। জাহাজটি ভারতের ওড়িশা উপকূল থেকে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রা করার সময়ও তার সঙ্গে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের যোগাযোগ ছিল।
মামুনের বড় ভাই জানান, গত বুধবার তার সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়। এরপর শুক্রবার জাহাজটি লৌহ আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়। পরে জাহাজটির দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পরিবার উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। এরপর থেকে মামুনের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
মামুনের বোন জানান, কয়েক দিন ধরে তারা ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ভাই কোথায় আছেন বা কী অবস্থায় আছেন—এমন কোনো তথ্য না থাকায় প্রতিটি মুহূর্ত উদ্বেগের মধ্যে কাটছে। পরিবারের সদস্যদের একমাত্র প্রত্যাশা, দ্রুত তার সন্ধান পাওয়া এবং তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা।
মামুনের মেজো ভাই আব্দুল্লাহ আল মাহমুদও একই দাবি জানিয়েছেন। তার প্রত্যাশা, ভারতীয় উদ্ধারকারী দল সমুদ্রপথ ও আকাশপথে অভিযান আরও জোরদার করবে এবং নিখোঁজ বাংলাদেশি মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের বিষয়ে দ্রুত নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে।
মামুনের বাল্যবন্ধু সাদাত আল কাবিজুও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তার তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শেষ দিকে মামুন জাহাজটিতে যোগ দেন। ওড়িশা উপকূল থেকে জাহাজটি ছাড়ার রাতেও মামুনের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও মামুনের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জাহাজটির দুর্ঘটনার বিষয়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘এমভি ওশান উইনার’ ওড়িশার পারাদ্বীপ বন্দর থেকে লৌহ আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। জাহাজটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৫ মিটার এবং এতে আনুমানিক ৭২ হাজার ১০০ মেট্রিক টন লৌহ আকরিক ছিল।
গত ২২ আগস্ট বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটের দিকে সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্র জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য পায়। এরপর আশপাশে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এমটি আইসোপোস’কে উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত করা হয়। পরে ভারতীয় কোস্টগার্ডের ‘বরদ’, ‘আনমোল’ ও ‘বিজিত’ নামের জাহাজগুলোও অভিযানে অংশ নেয়।
রাতে লাইফ র্যাফট থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া দুজনই চীনের নাগরিক। ফলে জাহাজে থাকা একমাত্র বাংলাদেশি ক্রু মামুনসহ আরও ২১ জনের অবস্থান এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ভারতীয় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড সমুদ্র ও আকাশপথে নিখোঁজদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্ধারকারী দল সমুদ্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় তল্লাশি পরিচালনা করছে। দুর্ঘটনার পর সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ ক্রুদের পরিবারের উৎকণ্ঠাও তত বাড়ছে।
এদিকে জাহাজটি ঠিক কী কারণে ডুবে গেছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও উদ্ধার তৎপরতার অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মামুনের পরিবার জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের সরকারের কাছে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার অনুরোধ করেছে। বিশেষ করে ভারতীয় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার এবং মামুনের অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত নিশ্চিত তথ্য দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা। একই সঙ্গে পরিবারের প্রত্যাশা, জীবিত কোনো ক্রুর সন্ধান পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাদের স্বজনদের অবহিত করবে।
জাহাজটিতে থাকা ২৪ জনের মধ্যে মামুন ছিলেন একমাত্র বাংলাদেশি। তাই তার সন্ধানে শুধু পরিবারের সদস্যরাই নন, বাংলাদেশি মেরিটাইম কর্মী ও সংশ্লিষ্ট মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন পরিবারের অপেক্ষা একটাই—সমুদ্র থেকে যেন দ্রুত কোনো আশাব্যঞ্জক খবর আসে এবং মামুনকে নিরাপদে ফিরে পাওয়া যায়।



