খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৮ অক্টোবর ২০২৫
সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধের এক ভয়াবহ ও অস্বাভাবিক দিক উন্মোচিত হয়েছে সম্প্রতি—যেখানে আফ্রিকার এই দেশটির সংঘাতে অংশ নিচ্ছেন শত শত কলম্বিয়ান ভাড়াটে সৈন্য। জঙ্গলে দীর্ঘদিন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকা এসব প্রাক্তন সেনা সদস্যদের কাছে শুরুতে সুদানের যুদ্ধটি ‘অস্বাভাবিকভাবে ধীর’ মনে হয়েছিল। তাদেরই একজন কার্লোস, যিনি বলেন, ‘সুদানে তারা রাতে ঘুমায়— এমনকি পাহারাও দেয় না, কারণ সবাই বিছানায় চলে যায়।’
কার্লোস জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর পর তারা অন্ধকার ভেদ করে শত্রুপক্ষের এলাকায় গভীর পর্যন্ত অগ্রসর হন। এরপর থেকেই লড়াই তীব্র হয়ে ওঠে, বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা।
দুই বছর ধরে চলা এই গৃহযুদ্ধে মুখোমুখি অবস্থানে আছে সরকারি সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ (আরএসএফ)। জাতিসংঘের হিসাবে, সংঘাতটি সুদানকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে নিমজ্জিত করেছে— যেখানে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, নারী ও শিশুদের উপর সংঘটিত হয়েছে অমানবিক নির্যাতন, আর গৃহহীন হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। এটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির ঘটনা।
উত্তর দারফুরের রাজধানী এল ফাশের শহরটি বর্তমানে সেনাবাহিনীর শেষ প্রধান ঘাঁটি। প্রায় ৫০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ এই শহরে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ আটকা পড়েছেন। সেখানে কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি দেড় বছর ধরে— শিশুরা বেঁচে আছে পশুখাদ্য খেয়ে। এই এলাকােই এখন মোতায়েন করা হয়েছে কলম্বিয়ান ভাড়াটে সৈন্যদের, যারা আরএসএফ-এর হয়ে লড়ছে। কার্লোসের ভাষায়, ‘যুদ্ধই এক ধরনের ব্যবসা।’
ভাড়াটে সৈন্যদের অংশগ্রহণের খবর প্রথম প্রকাশ পায় গত বছর, যখন কলম্বিয়ার সংবাদমাধ্যম লা সিলা ভাসিয়া জানায়—৩০০-রও বেশি সাবেক কলম্বিয়ান সেনা সুদানে যুদ্ধের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এরপর কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘটনায় ক্ষমা প্রার্থনা করে।
তবে তাদের ভূমিকা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কার্লোস স্বীকার করেছেন, সুদানে পৌঁছে প্রথমে তারা স্থানীয় সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই ছিল শিশু। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পগুলোতে হাজার হাজার প্রশিক্ষণার্থী ছিল— কিছু প্রাপ্তবয়স্ক, কিন্তু বেশিরভাগই শিশু। তারা আগে কখনও অস্ত্র ধরেনি। আমরা তাদের রাইফেল, মেশিনগান, আরপিজি চালাতে শিখিয়েছি। তারপর তাদের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হতো। আমরা জানতাম, তাদের যুদ্ধ করতে নয়, মরতে পাঠানো হচ্ছে।’
দারফুরের জামজাম শরণার্থী শিবিরেও কলম্বিয়ানদের উপস্থিতি দেখা গেছে। এপ্রিল মাসে এই শিবিরে আরএসএফ-এর হামলায় ৩০০ থেকে ১,৫০০ জন নিহত হয়। জাতিসংঘ একে যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা বলে বর্ণনা করে। স্থানীয় মুখপাত্র মোহাম্মদ খামিস দৌদা বলেন, ‘আমরা নিজের চোখে দ্বৈত অপরাধ দেখেছি— প্রথমে তারা আমাদের বাস্তুচ্যুত করেছে, এখন বিদেশি ভাড়াটেরা এসে আমাদের জায়গা দখল করেছে।’
কলম্বিয়ান সৈন্যদের অনেকেই জানিয়েছেন, তাদের বলা হয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতে তেল স্থাপনায় নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করতে হবে। তবে কার্লোস জানতেন, তিনি যুদ্ধে যাচ্ছেন— যদিও আফ্রিকার কোন দেশে, তা জানতেন না।
তার যাত্রা শুরু হয় বোগোটায়, যেখানে চিকিৎসা পরীক্ষার পর মাসে ২,৬০০ ডলারের বিনিময়ে চুক্তি করেন। পরে ইউরোপ হয়ে ইথিওপিয়া, সেখান থেকে সোমালিয়ার বসাসো শহরের এক আমিরাতি সামরিক ঘাঁটিতে নেওয়া হয়। সেখান থেকেই তাদের পাঠানো হয় সুদানের নিয়ালা শহরে—যা এখন কলম্বিয়ান ভাড়াটে বাহিনীর ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর কলম্বিয়া-বিষয়ক সিনিয়র বিশ্লেষক এলিজাবেথ ডিকিনসন বলেন, ‘কলম্বিয়া বহু দশক ধরে সশস্ত্র সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে। তাদের সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে দক্ষ, এবং অবসর নিলেও তাদের বয়স কম। তাই তারা সহজেই এমন প্রস্তাবে সাড়া দেয়।’
কলম্বিয়ান প্রাক্তন সেনারা এর আগে ইরাক, আফগানিস্তান ও ইউক্রেনেও যুদ্ধ করেছেন। গত বছর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রায় ৫০০ কলম্বিয়ান রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে ইউক্রেনে গেছেন।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই ব্যবসাকে বলেছেন ‘মানুষকে পণ্য বানিয়ে হত্যার শিল্প’। তিনি এটি নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্বল পুনর্বাসন ব্যবস্থা ও আর্থিক প্রলোভনের কারণে এই প্রবণতা থামানো কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞ শন ম্যাকফেইট বলেন, ‘আমরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি— যেখানে অতিধনীরা নিজেরাই সুপারপাওয়ার হয়ে উঠছে, আর ভাড়াটে যুদ্ধ আবারও ফিরে আসছে।’