রূপগঞ্জের ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সংলগ্ন রূপসী এলাকায় অবস্থিত গাজী টায়ারস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও নিখোঁজের ঘটনার দুই বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু গত ২৪ মাসের দীর্ঘ প্রতীক্ষাতেও কোনো স্বস্তির খবর পাননি নিখোঁজ ১৮২ জনের পরিবার। ২০২৪ সালের আগস্টে ঘটে যাওয়া সেই ট্র্যাজেডির পর থানা-পুলিশ, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন স্বজনরা। দিনশেষে তাঁদের ঝুলিতে জমেছে কেবল সরকারি আশ্বাস, মেলেনি প্রিয়জনদের কোনো হদিস কিংবা ঘটনার ন্যায়বিচার।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, নিখোঁজের তালিকায় থাকা ১৮২ জনের মধ্যে কারও জীবিত উদ্ধার হওয়ার বা কোনো সন্ধান পাওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশের ধারণা, ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ভবনের ভেতরেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। তবে এত দিনেও সরকারিভাবে কোনো ‘মৃত্যু ঘোষণা’ বা প্রাতিষ্ঠানিক সনদ না আসায় পরিবারগুলো পড়েছে চরম বিপাকে। স্বজন হারানো এই পরিবারগুলো মৃত্যুসনদ কিংবা ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের কোমলমতি সন্তানদের জন্মসনদ তৈরি আটকে গেছে, অনেক বিধবা নারী ভাতা কার্ড করাতে পারছেন না, এমনকি ব্যাংক বা এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি মাফ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় জটিলতার মুখে পড়েছেন। কোনো উপায় না পেয়ে কেউ কেউ তথ্যের সত্যতা আড়াল করার মতো বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
উপজেলার মৈকুলী এলাকার বাসিন্দা সিনথিয়া আক্তারের পরিবার এই অগ্নিকাণ্ডে হারায় তাঁর ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ভাই শাহাদাত শিকদার (৩০), ছোট ভাই সাব্বির শিকদার (২৬) এবং ভগ্নিপতি জমির আলীকে (৩৬)। ঘটনার তিন মাস পর জন্ম নেয় শাহাদাতের সন্তান আবদুল্লাহ। তবে গত ১৭ মাসেও শিশুটির কোনো জন্মসনদ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। দুচোখের পানি মুছতে মুছতে সিনথিয়া বলেন, “এত দিন পার হলেও কেউ ফেরেনি, আমরা বুঝতে পারছি তারা আর বেঁচে নেই। কিন্তু মৃত্যুসনদ না থাকায় জন্ম নিবন্ধন বা ওয়ারিশ সনদ কিছুই করতে পারছি না। ভাইয়ের নামে কিস্তির টাকা ছিল, মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় তা মাফ হচ্ছে না। প্রতিদিন কিস্তির লোকজন এসে কথা শোনায়।” সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম তিনজনকে হারিয়ে চরম আর্থিক কষ্টে থাকা সিনথিয়া বাধ্য হয়ে স্থানীয় একটি সাবান কারখানায় চাকরি নিয়েছেন।
একই চিত্র টেক্সটাইল মিলকর্মী মো. আরিফের (২৭) পরিবারে। তাঁর স্ত্রী ফারজানা দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে অনটনের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। বাসা ভাড়া দিতে না পেরে চলে গেছেন মায়ের আশ্রয়ে, বড় সন্তানের কেজি স্কুলের পড়াশোনা বন্ধ করে ভর্তি করিয়েছেন সরকারি স্কুলে। ফারজানা আক্ষেপ করে বলেন, “সবার দিন ঠিকই চলছে, কিন্তু আমাদের জীবন তো থমকে আছে।” অন্যদিকে, ছেলে আমান উল্লাহর সন্ধানে এখনো জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ স্টেশন আর পুড়ে যাওয়া কারখানার সামনে ছোটেন বৃদ্ধা মা রাশিদা বেগম। কেঁদে কেঁদে তিনি বলেন, “পোলাডার এক টুকরো হাড়গোড় বা একমুঠো পোড়া ছাই পেলেও বুকে চেপে ধরে দুঃখ ভুলে যেতাম, তাও তো পেলাম না।”
স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুতির পর আওয়ামী লীগের সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন গাজী টায়ারস কারখানায় প্রথম দফায় বড় ধরনের হামলা ও লুটপাট শুরু হয়। এরপর ২৫ আগস্ট ভোরে গোলাম দস্তগীর গাজী গ্রেপ্তার হলে ওই দিন রাতে দ্বিতীয় দফায় ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ১২টি ইউনিট টানা ২২ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ভবনটি অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। পরে পুলিশ আশপাশের শত শত স্বজনের আকুতির পরিপ্রেক্ষিতে ১৮২ জন নিখোঁজের তালিকা প্রস্তুত করে।
ঘটনার তদন্তে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুর রহমানকে প্রধান করে আট সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তাঁদের দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম দফার পর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও পুলিশি পাহারা থাকলে এত বড় অগ্নিকাণ্ড এড়ানো যেত। ১ সেপ্টেম্বর কারখানার সামনে আয়োজিত গণশুনানি শেষে স্বজনরা নিজেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভেতরে ঢুকে ১৫ খণ্ড হাড় উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। তবে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও সেই হাড়গুলোর ডিএনএ পরীক্ষার কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতি বা সরকারি সিদ্ধান্ত আসেনি। পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজদের অনুসন্ধানের তথ্য জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। রূপগঞ্জের এই অগ্নিকাণ্ড কেবল অবকাঠামোগত ক্ষতি নয়, বরং বহু পরিবারের জীবনপ্রবাহ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক করুণ দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।


