দেশে হামের সংক্রমণ ও হামের মতো উপসর্গ নিয়ে অসুস্থতার পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ১ হাজার ১৫৯ শিশুর শরীরে। একই সময়ে পরীক্ষায় আরও ৭২ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মঙ্গলবার প্রকাশিত নিয়মিত পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। ৩১ আগস্ট সকাল ৮টা থেকে ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম—দুই হিসাব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭৯ জনে।
এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৮৮০ জন। আর পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ৯৯ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মৃত্যুকে সন্দেহজনক হামজনিত মৃত্যু হিসেবে হিসাব করা হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হামজনিত কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংক্রমণের সামগ্রিক চিত্রও বেশ বড়। গত ১৫ মার্চ থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত বা সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৫০। একই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৩৮৪ জনের।
শুধু গত ২৪ ঘণ্টার হিসাবেই সন্দেহজনক ও নিশ্চিত—দুই ধরনের রোগী মিলিয়ে নতুন শনাক্তের সংখ্যা ১ হাজার ২৩১। অর্থাৎ প্রতিদিনের সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যাও এখনো হাজারের ঘরে রয়েছে। এর মধ্যে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তদের বড় একটি অংশকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫১৯ জন সন্দেহজনক হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৫৮ জন।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া এর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে গুরুতর সংক্রমণ হলে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক শিশুর মধ্যে এ ধরনের উপসর্গের উপস্থিতি স্বাস্থ্যসেবার ওপরও চাপ তৈরি করছে।
এ বছরের শুরুতে দেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে শুরু করার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল এবং আক্রান্তদের বড় অংশ ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। সংস্থাটি তখন পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করেছিল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ব্যাপকতা। টিকা না পাওয়া বা টিকার পূর্ণ ডোজ না পাওয়া শিশুরা হামের জটিলতায় বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি যেসব শিশু রুটিন টিকাদান থেকে বাদ পড়েছে, তাদের কাছে পৌঁছাতে অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
সরকার ইতোমধ্যে হামের বিস্তার ঠেকাতে অতিরিক্ত টিকাদান ও নজরদারি কার্যক্রম নিয়েছে। মে মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দ্বিতীয় ধাপের হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম ঈদের পর শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করতে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা, সন্দেহজনক রোগীদের যথাযথ পর্যবেক্ষণ এবং টিকাদান থেকে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে হামের উপসর্গ দেখা দিলে শিশুকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।
গত কয়েক মাসের ধারাবাহিক পরিসংখ্যান বলছে, সংক্রমণের চাপ এখনও কমেনি। ১৫ মার্চ থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ এবং সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ৯৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে—যাদের ৮৮০ জনের মৃত্যু হামের উপসর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ৯৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হামজনিত হিসেবে নথিভুক্ত।
ফলে দেশের চলমান হাম পরিস্থিতি শুধু আক্রান্তের সংখ্যা দিয়ে নয়, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, বিপুলসংখ্যক হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর ধারাবাহিকতার দিক থেকেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে সংক্রমণের গতি কমানো এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষিত করতে টিকাদান ও নজরদারি কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে চালানো যায়, সেটিই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।



