দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষককে বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ ও শোকজের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে দাবি উঠেছে। এসব ঘটনায় অনেক শিক্ষক মানসিক হয়রানি, বেতন বন্ধ, পদোন্নতি স্থগিত, প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতিপত্র না পাওয়ার মতো নানা সমস্যার মুখে পড়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, গত বছরের ৪ আগস্ট ‘এশিয়া পোস্ট’ নামে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ‘শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ২২ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের গোপন তৎপরতা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। প্রতিবেদনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের উল্লেখ করা হয়। তবে ওই তালিকায় নাম থাকা কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেছেন, তাঁরা ওই গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং সেখানে কোনো ধরনের কার্যক্রমেও অংশ নেননি। সংবাদ প্রকাশের পর তাঁদের কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের চাপ ও মানসিক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কাজী মোহাম্মদ নাফিজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের তদন্ত বা তথ্য-অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে সংবাদে নাম থাকা শিক্ষকদের পাশাপাশি ওই তালিকায় নাম না থাকা শিক্ষকদেরও তদন্তের আওতায় আনার অভিযোগ উঠেছে। অতীতে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষক প্যানেলকে সমর্থন করা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে কোনো পক্ষের সঙ্গে থাকার কারণেও কয়েকজন শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. আব্দুল ওদুদ, অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম ও ড. মোবারক হোসেনের বেতন বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষকের পদোন্নতি ও উচ্চতর পদে উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়া আটকে দেওয়া এবং বিভাগীয় ও পাঠদান কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. মুশফিক মান্নান চৌধুরীসহ ১১ জন শিক্ষক গুরুতর চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশ যাওয়ার জন্য অনাপত্তিপত্র পাননি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। শিক্ষকদের ভাষ্য, চিকিৎসার মতো ব্যক্তিগত ও জরুরি প্রয়োজনেও প্রশাসনিক অনুমতি আটকে রাখা হলে তা তাঁদের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের কক্ষে হামলা, ভাঙচুর ও হেনস্তার অভিযোগও সামনে এসেছে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিভাগের যোগ্য শিক্ষকদের বাদ দিয়ে অন্য একজনকে ডিনের দায়িত্ব দেওয়ার এবং এ নিয়ে প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পাল্টা তদন্ত কমিটি গঠনের অভিযোগ রয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার, সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগর, সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন ও অধ্যাপক সালমা খাতুনকে বহিষ্কারের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক তদন্তের নামে অস্বস্তিকর ও মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন এবং তাঁদের শোকজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষকদের একাংশের দাবি, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই যদি বেতন বন্ধ, বহিষ্কার, পদোন্নতি স্থগিত বা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে তা স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়া ও ন্যায্যতার প্রশ্ন তৈরি করে। তাঁদের মতে, কোনো শিক্ষক নির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কেবল কোনো তালিকায় নাম থাকা, রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ কিংবা কোনো গোষ্ঠীকে সমর্থনের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা একাডেমিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার তানভীর রহমান বিষয়টিকে উচ্চশিক্ষার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আরোপ করে চাকরিচ্যুত করা বা তাঁদের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া উচিত বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাক্-স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতেও মতপ্রকাশ ও শিক্ষার অধিকারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২৬ অনুচ্ছেদে শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৯ অনুচ্ছেদেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা রয়েছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৩ অনুচ্ছেদে শিক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একাডেমিক স্বাধীনতা ও শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইউনেস্কোর ১৯৯৭ সালের উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষক-কর্মীদের মর্যাদাবিষয়ক সুপারিশমালায় একাডেমিক স্বাধীনতা, পেশাগত স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং শিক্ষকদের ন্যায্য সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগ ও তদন্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারীদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ শিক্ষকরা যদি রাজনৈতিক পরিচয় বা বিতর্কিত অভিযোগের কারণে পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, পাঠদান ও জ্ঞানচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা মেধাবীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতাও বাড়াতে পারে বলে তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন।
তবে কোনো শিক্ষক নির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আপত্তি নেই। মূল প্রশ্নটি হচ্ছে, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ব্যক্তিগত মতামত কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পক্ষাবলম্বনকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা হবে কি না।
বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মুক্ত বিতর্কের প্রতিষ্ঠান। সেখানে অভিযোগের যথাযথ তদন্ত যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং ন্যায্য প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নেওয়া যেকোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ যদি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ কমে আসে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে তদন্তের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং নির্ধারিত সময়সীমা অনুসরণ করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে দ্রুত তা থেকে অব্যাহতি—দুই ক্ষেত্রেই ন্যায্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার অন্যতম শর্ত।



