বাংলাদেশে ফিরে আসার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন কিংবা কোনো সরকারের পূর্বানুমতির প্রয়োজন নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি স্পষ্ট করেছেন, ক্ষমতায় পুনরারোহণের উদ্দেশ্যে নয়, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক মন্দায় বিপর্যস্ত দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতেই তিনি জন্মভূমিতে ফিরতে চান। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফেরার প্রবল ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করে তিনি জানান, নির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও প্রবেশপথ যথাসময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। ভারতের এক অজ্ঞাত স্থানে অবস্থানকালে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-কে দেওয়া প্রথম টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এসব বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
সাক্ষাৎকারে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যর্পণ বা তাঁর দেশে ফেরাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে জটিল করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে দেওয়া যায় না বলেই তিনি দ্রুত ফিরতে বদ্ধপরিকর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের অর্থনীতির ইতিবাচক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, তাঁর মেয়াদে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় অভূতপূর্বভাবে বাড়লেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিহীনতায় সার্বিক অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। শিল্প খাতে ঐতিহাসিক মন্দা, চড়া মূল্যস্ফীতি, দুই কোটির বেশি মানুষের বেকারত্ব এবং দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সার সংকট গোটা জাতিকে এক চরম দুর্দশার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সারাদেশে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসা মামলা, হামলা ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ তুলে শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, আইনি ব্যবস্থাকে এখন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা ৬০০টিরও বেশি মামলাকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যা দেন তিনি। নিজের নিরাপত্তার চেয়ে দেশের সার্বিক অস্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের বিষয়টিই তাঁর কাছে প্রধান উদ্বেগের। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার রক্তাক্ত স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, জীবন নিয়ে তিনি কখনো শঙ্কিত ছিলেন না, ভবিষ্যতেও নন।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বা গুঞ্জন প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানান, ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী দলটি এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছে। কোনো দল রাজনীতিতে থাকবে কি থাকবে না, তার বিচার করবে এদেশের জনগণ—নির্বাচনের মাধ্যমে। কোনো সরকার অধ্যাদেশ জারি করে দেশের প্রাচীনতম এই রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব ও কোটি মানুষের জনসমর্থন মুছে ফেলতে পারবে না। তদুপরি, দেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নমুখী ধারায় ফেরাতে রাজনৈতিক সমঝোতার উর্ধ্বে উঠে জনগণের আদালতে উপস্থিত হওয়ার বিকল্প নেই।
দেশে তীব্র জ্বালানি ঘাটতি ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য সার কারখানাগুলো বন্ধ থাকার মাঝে চীন থেকে ২.৩ বিলিয়ন ডলারে জে-১০সিই (J-10CE) যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেখানে সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জন্য হাহাকার করছে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সেখানে বিপুল অংকের অর্থ খরচ করে যুদ্ধবিমান কেনা কতটুকু যৌক্তিক? একইসাথে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি সতর্ক করেন যে, দেশে উগ্রবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর অপ তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষায়িত কাউন্টার-টেররিজম ইউনিটগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা এবং কারাবন্দী উগ্রবাদীদের মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং ভারত, মিয়ানমার ও দক্ষিণ এশীয় পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
ভারতে অবস্থানকালীন অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজ দেশের মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকা একজন রাজনীতিকের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক। তিনি ভারত সরকার ও সেদেশের জনগণের আতিথেয়তা ও সম্মানের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। কিন্তু তাঁর মন সবসময়ের জন্য বাংলাদেশে পড়ে রয়েছে। বাংলা ভাষা, দেশের মাটি আর সাধারণ মানুষের হাসিমুখ প্রতিদিন তাঁকে টানে। ভয় নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বিশ্বাসী একটি সার্বভৌম বাংলাদেশ পুনর্গঠন করতেই তিনি অনতিবিলম্বে দেশের মাটিতে পা রাখতে চান।



