ওভাল, ১৯৮৭। লর্ডস, ২০২৬। লন্ডনের দুটি ঐতিহাসিক টেস্টের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ৩৯ বছর হলেও পাকিস্তানের জন্য দুটির পরিণতি যেন একই জায়গায় এসে মিলেছে। রোববার লর্ডসে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে সিরিজ পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর টেস্ট ক্রিকেটে পাকিস্তানের জয়-হারের হিসাব আবারও নেতিবাচক হয়ে গেছে। সর্বশেষ ম্যাচ শেষে পাকিস্তানের টেস্ট জয় ১৫৩টি, আর হার ১৫৪টি।
টেস্ট ইতিহাসে এর আগে সর্বশেষ পাকিস্তানের জয়ের চেয়ে হারের সংখ্যা বেশি হয়েছিল ১৯৮৭ সালের ওভাল টেস্টের পর। সেই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে জাভেদ মিয়াঁদাদের ডাবল সেঞ্চুরি, সেলিম মালিক ও অধিনায়ক ইমরান খানের সেঞ্চুরিতে পাকিস্তান ৭০৮ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়েছিল। এত বড় স্কোরের পরও ইংল্যান্ড ফলো-অনে পড়ে ম্যাচটি ড্র করতে সক্ষম হয়। ম্যাচ শেষে পাকিস্তানের জয়-হারের হিসাব দাঁড়িয়েছিল ৩৯-৪০।
তবে সেই অবস্থায় বেশি দিন থাকেনি পাকিস্তান। একই বছর ঘরের মাঠে ফিরতি সিরিজের প্রথম টেস্টে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে জয় ও পরাজয়ের সংখ্যা ৪০-৪০ করে ফেলে তারা। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে জয়ের পাল্লাই ভারী হয়েছে। ২০০৩, ২০০৪ ও ২০০৬ সালে তিনবার পাকিস্তানের জয়-হারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ১৮-তে পৌঁছায়। এমনকি ২০১৬ সালেও ব্যবধান ছিল +১৭।
এরপর শুরু হয় উল্টো যাত্রা। সর্বশেষ ৭২ টেস্টে পাকিস্তান জিতেছে ২৩টি, বিপরীতে হেরেছে ৪১টি। ২০১৫ সালের শেষে দলটির টেস্ট জয়-হারের অনুপাত ছিল ১.১৩৫। ২০১৬ সাল থেকে সেই অনুপাত নেমে দাঁড়িয়েছে ০.৬২৭-এ। অর্থাৎ ব্যবধান কমেছে ০.৫০৮, যা এই সময়ে টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন।
এই সূচকে পাকিস্তানের পরেই রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তাদের জয়-হারের অনুপাতের পতন ০.৪৩৭। এ সময়ে পিছিয়েছে আরও দুটি দল—ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা। ইংল্যান্ডের পতন ০.১০০ এবং শ্রীলঙ্কার ০.০১৩।
অন্যদিকে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বাংলাদেশ, ভারত, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ের ক্ষেত্রে। ২০১৬ সালের পর টেস্টে জয়-হারের অনুপাত এসব দলের বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে, লাল বলের ক্রিকেটে দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
গত এক দশকের হিসাবে জয়-হারের অনুপাতে সবচেয়ে এগিয়ে অস্ট্রেলিয়া। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে দলটি ৫৭টি টেস্ট জিতেছে এবং হেরেছে ২৮টি। জয়-হারের অনুপাত ২.০৩৫। ২০১৫ সালের শেষ পর্যন্ত এই অনুপাত ছিল ১.৭৭৮। অর্থাৎ উন্নতি হয়েছে ০.২৫৭।
উন্নতির ব্যবধানের হিসাবে অবশ্য অস্ট্রেলিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ খেলেছে ৬৮টি টেস্ট। এর মধ্যে জয় ২১টি, হার ৪৩টি। জয়-হারের অনুপাত ০.৪৮৮। ২০১৫ সালের শেষে বাংলাদেশের এই অনুপাত ছিল মাত্র ০.০৯৮। অর্থাৎ ব্যবধান বেড়েছে ০.৩৯০।
সাম্প্রতিক সময়ের হিসাবেও বাংলাদেশের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে হিসাব করলে জয়-হারের অনুপাতে টেস্টে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এই সময়ে ১১টি টেস্ট খেলে নাজমুল হোসেনের দল জিতেছে ৬টি, হেরেছে ৪টি। জয়-হারের অনুপাত ১.৫।
এই সময়ে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছে নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। দুই দলই ৭টি করে টেস্ট জিতেছে, হার মাত্র ১টি করে। ফলে জয়-হারের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৭.০।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে দলটি ১১টি টেস্ট খেলে জিতেছে মাত্র ৩টি, আর হেরেছে ৮টিতে। ফলে জয়-হারের অনুপাত নেমে এসেছে ০.৩৭৫-এ।
পরিসংখ্যান তাই একটি স্পষ্ট প্রবণতার কথাই বলছে। একসময় টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে জয়ের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ানো পাকিস্তান এখন সেই ব্যবধানই হারিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ, ভারত ও নিউজিল্যান্ডসহ কয়েকটি দলের পারফরম্যান্সে দেখা যাচ্ছে উন্নতির ধারাবাহিকতা। লাল বলের ক্রিকেটে সাম্প্রতিক এক দশকের পরিবর্তনের এই চিত্রে পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের পতন যেমন চোখে পড়ার মতো, তেমনি বাংলাদেশের উত্থানও হয়ে উঠেছে উল্লেখযোগ্য।



