আঁখির আড়ালে চলে গেছো, তবু রয়েছো হৃদয়জুড়ে
বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী জগন্ময় মিত্র
বাংলা কাব্যগীতির আকাশে কিছু কণ্ঠস্বর থাকে, যাদের গান শুধু শোনা যায় না—অনুভব করা যায়। কিছু কণ্ঠ সময়ের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে এমনভাবে মিশে থাকে, যে শিল্পী চলে গেলেও তাঁর গান থেকে যায় ভালোবাসার মতো, স্মৃতির মতো। জগন্ময় মিত্র তেমনই এক অবিস্মরণীয় নাম।
বাংলা আধুনিক ও নজরুলগীতির পাশাপাশি ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পাসহ সঙ্গীতের প্রায় সব প্রচলিত ধারাতেই ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তবে কাব্যগীতির শিল্পী হিসেবেই তিনি অর্জন করেছিলেন অনন্য খ্যাতি। তাঁর কণ্ঠে প্রেম, বিরহ, অপেক্ষা ও মর্মবেদনা যেন পেয়েছিল এক নিজস্ব ভাষা।
১৯৪৮ সালে রেকর্ড করা তাঁর অমর গান—‘চিঠি—তুমি আজ কত দূরে’ তাঁকে এনে দেয় কিংবদন্তির মর্যাদা। লক্ষ-কোটি শ্রোতা গানটিকে যেন নিজেরই লেখা কোনো না-পাঠানো প্রেমপত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। প্রিয় মানুষটির দূরত্ব, অপেক্ষা আর বুকের গোপন হাহাকার—সবকিছু মিলেমিশে গিয়েছিল এই গানের কথায় ও সুরে।
এই গানটি বাংলা আধুনিক তথা কাব্যগীতির ইতিহাসে অন্যতম সর্বাধিক জনপ্রিয় ও বিক্রীত একক গান হিসেবে বিবেচিত। এইচএমভির হিসাব অনুযায়ী, ৭৮ আরপিএম রেকর্ড থেকে শুরু করে ক্যাসেটের যুগ পর্যন্ত গানটির প্রায় ২৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল—যা সেই সময়ের বাংলা গানের জগতে এক বিস্ময়কর সাফল্য।
শোকের ঘরে জন্ম, সুরের ভুবনে বেড়ে ওঠা
১৯১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতার এক সঙ্গীতমনস্ক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জগন্ময় মিত্র। তাঁর জন্মের সময় পরিবারটি ছিল গভীর শোকে আচ্ছন্ন। কারণ, তাঁর জন্মের মাত্র মাসাধিককাল আগে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর বাবা যতীন্দ্রনাথ মিত্র পরলোকগমন করেন।
বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন জগন্ময়। পিতৃহারা, ভাই-বোনহীন এই শিশুটির জীবন শুরু হয়েছিল এক বিষণ্ণ পরিবেশে। কিন্তু সেই শোকের আবহেই তাঁর জীবনে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় সুরের প্রতি গভীর ভালোবাসা।
প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় বাড়িতেই। পরে ১৯৩৪ সালে এন্ট্রান্স পাস করেন। তবে লেখাপড়ার পাশাপাশি তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর সঙ্গীতসাধনা।
তাঁর পিতামহ বিধুভূষণ মিত্র এবং কাকা পঞ্চানন মিত্র ছিলেন সঙ্গীতানুরাগী। কাকা চমৎকার হারমোনিয়াম বাজাতেন এবং ওস্তাদের কাছে রাগ-রাগিণীর তালিম নিতেন। ছোট্ট জগন্ময় পাশে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনতেন সেই সুরের সাধনা। বলা যায়, সেই শৈশবেই তাঁর অন্তরে বপন হয়েছিল সঙ্গীতের প্রথম বীজ।
মাত্র ১০-১১ বছর বয়সে কেশব মুখোপাধ্যায়ের কাছে তিনি ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পাসহ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নানা ধারায় তালিম নেওয়া শুরু করেন।
প্রতিভার প্রথম স্বীকৃতি
১৯৩৮ সালে বেঙ্গল মিউজিক অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি ধ্রুপদ, টপ্পা, ঠুংরি, রাগপ্রধান বাউল ও কীর্তন—প্রতিটি বিভাগেই প্রথম স্থান অর্জন করেন। কাব্যসঙ্গীত বিভাগে হয়েছিলেন তৃতীয়।
সেই বছরই তাঁর জীবনে আসে আরেকটি বড় সুযোগ—এইচএমভিতে গান রেকর্ড করার সুযোগ। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় সঙ্গীতযাত্রা।
প্রণব রায়ের কথায় এবং কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘প্রিয় হতে প্রিয়তর’ ও ‘তোমার মতন কত না নয়ন’ গান দুটি তাঁকে এনে দেয় প্রথম বড় পরিচিতি।
নজরুলের স্নেহধন্য শিল্পী
এইচএমভিতে জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে ‘যদি বাসনা মনে দিবে দহন জ্বালা’ গানটি শুনে কাজী নজরুল ইসলাম মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর কণ্ঠের প্রশংসা করেছিলেন আন্তরিকভাবে। সেই সূত্রেই কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে গড়ে ওঠে জগন্ময় মিত্রের আজীবনের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক।
নজরুলগীতির পাশাপাশি ১৯৪১ সালে তিনি কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীতও রেকর্ড করেন।
১৯৪২ সালে তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড হয় দুটি অসামান্য কাব্যগীতি—‘সাতটি বছর আগে’ এবং ‘সাতটি বছর পরে’। পরবর্তীকালে ‘চিঠি—তুমি আজ কত দূরে’ গানটির সঙ্গে এই গান দুটি মিলে গড়ে ওঠে বাংলা কাব্যগীতির এক অনন্য, আবেগময় ও স্মরণীয় মরমী ত্রয়ী।
প্রেম-বিরহের এক অনন্ত শিল্পী
চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকজুড়ে একের পর এক কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন জগন্ময় মিত্র।
‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে’,
‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’,
‘যাদের জীবন ভরা শুধু আঁখিজল’,
‘তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন’,
‘ভুলি নাই ভুলি নাই’,
‘মেনেছি গো হার’,
‘আমি স্বপন দেখেছি’,
‘স্বপন সুরভী মাখা’,
‘গভীর নিশীথে ঘুম’,
‘প্রেমের তাজমহল’,
‘হৃদয় যেন কাহারে চেয়েছিল’,
‘তোমারে তো আজও ভুলি নাই’,
‘শাওনও রাতে যদি’—
এমন অসংখ্য গান তাঁর কণ্ঠে পেয়েছে অনন্য প্রাণ। তাঁর গান শুনে মানুষ কখনো প্রেমে পড়েছে, কখনো হারানো প্রিয়জনকে মনে করেছে, কখনো বা নিঃসঙ্গ রাতে নিজের অশ্রুর সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে তাঁর কণ্ঠের মর্মবেদনা।
জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে প্রেম ছিল কোমল, বিরহ ছিল গভীর, আর অপেক্ষা ছিল অসীম। তাঁর গান যেন বলত—প্রিয় মানুষটি যত দূরেই থাকুক, হৃদয়ের ভেতর তার জন্য একটি দরজা সবসময় খোলা থাকে।
আঁখির আড়ালে, তবু হৃদয়জুড়ে
২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় বাংলা গানের এই কালজয়ী কণ্ঠ। তিনি চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর গান চলে যায়নি।
তিনি রেখে গেছেন এমন এক মায়াময় সঙ্গীতভুবন, যেখানে প্রেমিকেরা আজও হারানো প্রিয়তমাকে খোঁজে, বিরহীরা আজও অপেক্ষার প্রহর গোনে, আর নিঃসঙ্গ মানুষ গভীর রাতে তাঁর গানে খুঁজে পায় নিজের না-বলা কথাগুলো।
শিল্পী চলে যান, কণ্ঠ স্তব্ধ হয়—কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীর মৃত্যু হয় না। তাঁর সৃষ্টি তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
জগন্ময় মিত্রও তাই আজ আমাদের আঁখির আড়ালে।
তবু—
রয়েছেন হৃদয়জুড়ে।
যতদিন বাংলার মানুষ প্রেমে পড়বে,
যতদিন কেউ দূরের প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করবে,
যতদিন কোনো নিঃসঙ্গ রাতে পুরোনো দিনের গান বেজে উঠবে—
ততদিন জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠ ফিরে ফিরে আসবে আমাদের হৃদয়ের গভীরে।
‘চিঠি—তুমি আজ কত দূরে’ তখন শুধু একটি গান থাকবে না—
হয়ে উঠবে আমাদেরই কোনো হারানো ভালোবাসার চিঠি।
অমর শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।



