বাংলাদেশের জীবন বিমা খাত মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অনিষ্পন্ন বিমা দাবি সেই আস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে, দেশের জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর কাছে মোট ৪ হাজার ৪১২ কোটি টাকার বিমা দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এই বিপুল অর্থ গ্রাহক ও তাদের পরিবারের প্রাপ্য হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা সময়মতো পরিশোধ হচ্ছে না।
জীবন বিমার মূল উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার সময়ে গ্রাহক ও তাঁর পরিবারের পাশে আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে দাঁড়ানো। একজন গ্রাহক বছরের পর বছর নিয়মিত কিস্তি বা প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন এই প্রত্যাশায় যে বিমার মেয়াদ পূর্ণ হলে, কিংবা চুক্তিতে উল্লেখিত কোনো ঘটনা ঘটলে, তাঁর প্রাপ্য অর্থ দ্রুত পাওয়া যাবে। কিন্তু দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ব্যবধান তৈরি করেছে।
অনিষ্পন্ন দাবির সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে। প্রতিষ্ঠানটির কাছেই ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকার বেশি দাবি আটকে আছে, যা মোট অনিষ্পন্ন দাবির তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি। পদ্মা ইসলামী লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, প্রগ্রেসিভ লাইফ ও বাইরা লাইফসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দাবি জমে রয়েছে। ফলে সমস্যাটি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং পুরো খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর। বিশেষ করে গ্রামের স্বল্প আয়ের মানুষ, যারা কয়েক হাজার টাকার দাবিও দীর্ঘদিন ধরে আদায়ের জন্য ঘুরছেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। অনেক গ্রাহকের পক্ষে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার মতো অর্থ, সময় বা সুযোগ থাকে না। ফলে বিমার টাকা পাওয়ার পরিবর্তে তাদের এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে।
দাবি নিষ্পত্তিতে জট কমাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাম্প্রতিক উদ্যোগ অবশ্য কিছুটা অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি করেছে। আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাতটি বিমা প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহকের হাতে মোট ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়। গ্রাহকদের জন্য এই অর্থ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সামগ্রিক সংকটের তুলনায় এর পরিমাণ অত্যন্ত কম। ৪ হাজার ৪১২ কোটি টাকার অনিষ্পন্ন দাবির বিপরীতে ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা মোট বকেয়ার এক শতাংশেরও কম।
ফলে এককালীন চেক বিতরণ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং কেন বছরের পর বছর দাবি জমছে, কীভাবে কোম্পানিগুলো এই দায় তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের পরিস্থিতি আবার না হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ বিমা ব্যবসায় গ্রাহক সংগ্রহের উচ্চ ব্যয়। কিছু ক্ষেত্রে একটি নতুন বিমা পলিসি সংগ্রহ করতে প্রথম বছরের প্রিমিয়ামের দেড় গুণেরও বেশি ব্যয় হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। গ্রাহক সংগ্রহের জন্য অতিরিক্ত কমিশন, বড় ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং বিস্তৃত প্রতিনিধি নেটওয়ার্ক এই ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
সমস্যা আরও জটিল হয় যখন কোনো গ্রাহক এক বা দুই বছরের মধ্যে পলিসি বন্ধ করে দেন। তখন নতুন গ্রাহক সংগ্রহে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল, তা ভবিষ্যৎ প্রিমিয়ামের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের সুযোগ কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদি বিমা ব্যবসার জন্য এটি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। একটি বিমা প্রতিষ্ঠানের হিসাবের খাতায় পর্যাপ্ত সম্পদ থাকলেও প্রয়োজনের সময়ে নগদ অর্থের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যদি ভবিষ্যৎ পরিশোধের দায়ের সঙ্গে সম্পদের মেয়াদ ও নগদপ্রবাহের যথাযথ সমন্বয় না থাকে। বিমা কোম্পানির জন্য তাই শুধু সম্পদের পরিমাণ যথেষ্ট নয়; কখন কত অর্থ পরিশোধ করতে হবে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তরল সম্পদও প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন ও গ্রাহক সংগ্রহের ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা কার্যকরভাবে মানানো, বিমা কোম্পানির সম্পদ ও দায়ের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত দাবি পরিশোধে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে দাবি পরিশোধে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একইভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে সমস্যার বোঝা আরও বাড়তে পারে।
জীবন বিমা খাতের সংকট কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতার বিষয় নয়। এটি গ্রাহকের আস্থা, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িত। বিমার জন্য মানুষ যে অর্থ বছরের পর বছর জমা দেন, সেটি মূলত ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলার একটি ব্যবস্থা। সেই অর্থ পাওয়ার সময় যদি গ্রাহককে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যাওয়া স্বাভাবিক।
তাই এখন প্রয়োজন সাময়িক অর্থ বিতরণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। দাবি নিষ্পত্তির সময়সীমা কার্যকর করা, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়মিত পর্যালোচনা, অতিরিক্ত পরিচালন ও গ্রাহক সংগ্রহ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। এসব পদক্ষেপ কার্যকর না হলে আজকের ৪ হাজার ৪১২ কোটি টাকার দাবি জট ভবিষ্যতে আরও বড় আকার নিতে পারে।
জীবন বিমার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ বিমা কোম্পানির কাছে দাবি পরিশোধ কোনো অনুগ্রহ নয়—চুক্তি অনুযায়ী সেটিই তাদের মৌলিক দায়িত্ব।


