বাংলাদেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসা, গবেষণা ও জনসচেতনতার ইতিহাসে যে কয়েকটি নাম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে স্মরণ করতে হয় জাতীয় অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিমকে। তিনি শুধু একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক ছিলেন না—ছিলেন একজন দূরদর্শী সমাজসংস্কারক, মানবহিতৈষী এবং জনস্বাস্থ্যের এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।
বাংলাদেশে ডায়াবেটিসকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং এর চিকিৎসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য। তাঁর হাত ধরেই এ দেশে গড়ে ওঠে এমন একটি চিকিৎসাব্যবস্থা, যার মূল দর্শন ছিল—রোগীকে শুধু চিকিৎসা নয়, রোগ সম্পর্কে জ্ঞান, সচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পথও দেখাতে হবে।
তাঁর প্রকৃত নাম ছিল শেখ আবু মোহাম্মদ ইব্রাহিম। পরবর্তীকালে তিনি ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিম নামেই সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেন।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
১৯১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর ইউনিয়নের খাঁড়েরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা শেখ মৌলভী মুহম্মদ কিসমতুল্লাহ এবং মাতা আজিম-উন-নিসা বিবি।
দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। গ্রামের মধ্য বাংলা স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরে ভর্তি হন সালার এডওয়ার্ড ইংলিশ হাইস্কুলে। সেখান থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন।
এরপর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ভর্তি হন কলকাতা মেডিকেল কলেজে। ১৯৩৮ সালে চিকিৎসাবিদ্যার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শুরু করেন তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় চিকিৎসকজীবন।
চিকিৎসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
কর্মজীবনের শুরুতেই কলকাতা মেডিকেল কলেজের প্রফেসর অব মেডিসিনের ওয়ার্ডে হাউস ফিজিশিয়ান হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। পরবর্তীতে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত একই প্রতিষ্ঠানে ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার এবং প্র্যাকটিক্যাল ফার্মেসি বিভাগের সিনিয়র ডেমনস্ট্রেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দেশভাগের পর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। চট্টগ্রামে যোগ দেন সিভিল সার্জন হিসেবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিনের শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে যান। ১৯৪৮ সালে যুক্তরাজ্য থেকে MRCP এবং পরের বছর আমেরিকান কলেজ অব চেস্ট ফিজিশিয়ানস থেকে FCCP ডিগ্রি অর্জন করেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
১৯৫০ সালে দেশে ফিরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের এডিশনাল ফিজিশিয়ান হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ক্লিনিক্যাল মেডিসিন এবং মেডিসিনের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু চিকিৎসক হিসেবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রচলিত চিকিৎসাসেবার চেয়েও অনেক বিস্তৃত। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা শুধু ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন রোগীর শিক্ষা, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, নিয়মিত পরীক্ষা, শৃঙ্খলা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক।
এই উপলব্ধিই তাঁকে ডায়াবেটিস চিকিৎসার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও সংগঠিত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখায়।
ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠা
১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সমাজসেবীর সহযোগিতায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান ডায়াবেটিক সমিতি। ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিম ছিলেন এই উদ্যোগের মূল প্রাণপুরুষ।
তাঁর নেতৃত্বে ডায়াবেটিস চিকিৎসা ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত ও আধুনিক রূপ পেতে শুরু করে। পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশের ডায়াবেটিক চিকিৎসা ও গবেষণার অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।
১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডায়াবেটিক হাসপাতাল—যা পরবর্তীকালে বারডেম (BIRDEM) হাসপাতাল হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে। ডা. ইব্রাহিমের স্বপ্ন ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে অর্থনৈতিক সামর্থ্য নয়, রোগীর প্রয়োজনই হবে চিকিৎসার প্রধান বিবেচনা।
এই দর্শনের মধ্যেই ছিল তাঁর মানবিকতার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ।
চিকিৎসার পাশাপাশি মানবসেবা
ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিম বিশ্বাস করতেন, একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব শুধু রোগ নিরাময় করা নয়; মানুষের জীবনযাপনকে সুস্থ ও নিরাপদ করে তোলাও তাঁর দায়িত্ব।
ডায়াবেটিসকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত অসুস্থতা হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখেছিলেন এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাতও। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি ডায়াবেটিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় আনা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা বিস্তারে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীকালে শুধু হাসপাতাল হিসেবে নয়, চিকিৎসা, গবেষণা, শিক্ষা ও জনসচেতনতার একটি সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়।
বহুমাত্রিক দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৯৫৮ সালে তিনি আমেরিকান কলেজ অব চেস্ট ফিজিশিয়ানস-এর পাকিস্তান চ্যাপ্টারের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬২ সালে পাকিস্তান কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস থেকে FCPS ডিগ্রি লাভ করেন। একই বছর থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিনের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনসেবায় তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন বহু সম্মাননা।
১৯৬৩ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে সিতারা-ই-খিদমত উপাধিতে ভূষিত করে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়।
১৯৮৪ সালে তিনি জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন। চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন দেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক।
১৯৮৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হন এবং চিকিৎসা ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য লাভ করেন মাহবুব আলী খান পুরস্কার।
১৯৮৬ সালে জর্ডানে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তাঁকে প্রতিষ্ঠাতা ফেলো নির্বাচিত করা হয়। একই বছর চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি কুমিল্লা ফাউন্ডেশনের স্বর্ণপদক লাভ করেন।
একটি মানুষের স্বপ্ন থেকে এক বিশাল প্রতিষ্ঠান
ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিমের সবচেয়ে বড় কীর্তি হয়তো কোনো একটি ডিগ্রি, পদ বা পুরস্কার নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন—তিনি এমন একটি চিকিৎসা-দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর পরও বিস্তৃত হয়েছে।
তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন চিকিৎসক চাইলে তাঁর পেশাকে মানবসেবার এক মহৎ আন্দোলনে পরিণত করতে পারেন।
ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগকে ভয় নয়, জ্ঞান ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে মোকাবিলা করার যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে, তার পেছনে ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিমের অবদান অপরিসীম।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত আন্দোলন পরবর্তীকালে অসংখ্য রোগীকে চিকিৎসা, শিক্ষা ও আশ্রয় দিয়েছে; অসংখ্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষিত করেছে; আর ডায়াবেটিস সম্পর্কে কোটি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করেছে।
অন্তিম যাত্রা
১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মানবহিতৈষী এই চিকিৎসকের বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটে।
কিন্তু মানুষের কল্যাণে নিবেদিত মানুষের মৃত্যু কখনো তাঁর কর্মের মৃত্যু ঘটায় না।
ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিম আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর হাতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান, তাঁর চিকিৎসা-দর্শন এবং মানুষের জন্য তাঁর রেখে যাওয়া সেবার আদর্শ আজও জীবন্ত।
তিনি ছিলেন এমন এক চিকিৎসক, যিনি রোগীর শরীরের পাশাপাশি মানুষের জীবনকেও দেখেছিলেন।
তিনি ছিলেন এমন এক স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি একটি রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি আন্দোলন।
আর তিনি ছিলেন এমন এক মানবহিতৈষী, যাঁর কাছে চিকিৎসা ছিল শুধু পেশা নয়—মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব পালনের এক মহান অঙ্গীকার।
ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিমের প্রতি
গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞ স্মরণ।
তাঁর কর্ম ও আদর্শ আমাদের জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাসেবা ও মানবকল্যাণের পথে অনন্তকাল প্রেরণা হয়ে থাকুক।



