দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও তীব্র হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৫৮ জন, যা চলতি বছরে এক দিনে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তির সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর মধ্য দিয়ে ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৫ জনে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৭৩ হাজার।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এই তথ্য পাওয়া গেছে।
নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার ৩৫৬ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৪৫ জন, খুলনা বিভাগে ৩২৯ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩১১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ২২৭ জন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নতুন রোগীর সংখ্যা ১৯৭ জন।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে ১৩২ জন, রংপুর বিভাগে ৭৩ জন এবং সিলেট বিভাগে ১২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এক দিনের ব্যবধানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ১৫৮ জন।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তির দৈনিক সংখ্যা কয়েক দফা নতুন রেকর্ড তৈরি করেছিল। ৬ সেপ্টেম্বর এক দিনে ১ হাজার ৫৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দৈনিক ভর্তি রোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। ২৩ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৮৬৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।
তবে ২৭ সেপ্টেম্বরের ২ হাজার ১৫৮ জনের সংখ্যা আগের সব দৈনিক রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছর ডেঙ্গুর বিস্তার যে নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে, এই পরিসংখ্যান তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মোট আক্রান্ত ও সুস্থতার চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৭৩ হাজার ৬৯৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৮ হাজার ৬ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। গত ২৪ ঘণ্টাতেই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৭৫৫ জন।
অন্যদিকে, নতুন ছয় মৃত্যুর পর চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২৫ জনে। ফলে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও, এক দিনে রোগী ভর্তির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের সাম্প্রতিক প্রবণতাও পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি স্পষ্ট করছে। ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৯০ এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৩ হাজার ৬২৭। দুই দিনের ব্যবধানে ২৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ২০১ এবং আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৭ হাজার ৩৬৭-এ পৌঁছায়।
আগের দুই বছরের তুলনায় পরিস্থিতি
গত বছরের তুলনায় ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যেই অর্ধেকের বেশি হলেও, চলতি বছরের এখনও প্রায় তিন মাস বাকি। ২০২৫ সালের পুরো বছরে দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মারা গিয়েছিলেন ৪১৩ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৫৭৫।
আর ২০২৩ সাল ছিল বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতম বছরগুলোর একটি। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানেও ২০২৩ সালের এই সংখ্যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ হিসেবে রয়েছে।
চলতি বছরের চিত্র অবশ্য এখনই পুরো বছরের সঙ্গে তুলনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ দিচ্ছে না। কারণ বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে সামনে নতুন রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়ানো নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত মশকনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানোও জরুরি। একই সঙ্গে জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
২৭ সেপ্টেম্বরের নতুন পরিসংখ্যান সেই সতর্কতার প্রয়োজন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এক দিনে ২ হাজার ১৫৮ জনের হাসপাতালে ভর্তি এবং ছয়জনের মৃত্যু দেখিয়ে দিচ্ছে, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার পাশাপাশি জনসচেতনতা ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম—দুই ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক তৎপরতা প্রয়োজন।


