পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির বিরোধের জেরে ভাবিকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা এবং চার বছরের শিশুকন্যাকে গুরুতর আহত করার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় মো. আজলু মিয়া (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আসামিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সুনামগঞ্জের প্রথম অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ আকবর হোসেন আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলার বিবরণ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর দিরাই পৌরসভার নতুন বাগবাড়ী এলাকায় এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে পারিবারিক ও পৈতৃক জমি বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে আসামি আজলু মিয়ার সঙ্গে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বাদানুবাদ চলে আসছিল। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় বিরোধ চরম আকার ধারণ করলে আজলু মিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে বসতঘরে ঢুকে পড়েন। এ সময় তিনি সঙ্গে থাকা লোহার হাতুড়ি দিয়ে তার ভাবি হামিদা খানমের (৬০) ওপর উপর্যুপরি আক্রমণ চালান।
হামিদা খানমকে বাঁচাতে পাশে থাকা তার চার বছরের নাতনি রুমা আক্তার সীমা এগিয়ে এলে ঘাতক আজলু মিয়া শিশুটির ওপরও নৃশংসভাবে হাতুড়ি দিয়ে হামলা চালান। লোহার হাতুড়ির প্রচণ্ড আঘাতে ঘটনাস্থলেই হামিদা খানমের করুণ মৃত্যু হয় এবং শিশু সীমা মাথায় গুরুতর চোট পেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
ঘটনার আকস্মিকতায় আশপাশের লোকজন ছুটে এসে রক্তের দাগ ও রক্তমাখা হাতুড়িসহ আজলু মিয়াকে ঘরের ভেতর থেকেই হাতেনাতে আটক করেন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে সংজ্ঞাহীন ও গুরুতর আহত শিশু সীমাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান এবং ধাওয়া করে আটক করা আজলু মিয়াকে দিরাই থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর নিহতের জামাতা মো. মফশির বাদী হয়ে দিরাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনার সত্যতা পেয়ে আসামি আজলু মিয়াকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারক দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আসামির বিরুদ্ধে আনীত হত্যা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে এ সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত কলহ কিংবা পৈতৃক সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে সহিংসতা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল ও মফস্বলে প্রায়শই অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ঘটায়। আইনি প্রক্রিয়া ও দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা জমিজমার বিরোধ নিরসনে স্থানীয় মধ্যস্থতা বা আদালতের শরণাপন্ন না হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাই এসব সামাজিক অপরাধের অন্যতম কারণ। এ রায়ে নিহতের পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত শাস্তি কার্যকরের দাবি জানিয়েছে।


