বাস পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিমার ৭৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধের নির্দেশ বহাল

ভারতের রাজস্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় একজন মোটরসাইকেলচালকের মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ জনতার আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি পর্যটক বাসের বিমা দাবির ৭৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ বহাল রেখেছেন রাজ্য ভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন। বাসমালিক ও বিমা কোম্পানির করা পৃথক আপিল খারিজ করে কমিশন আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। ফলে ৩৮ লাখ রুপি বিমাকৃত মূল্যের বাসটির জন্য নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ কমানোর বা বাড়ানোর কোনো পরিবর্তন হয়নি।
রাজস্থানের যোধপুরে অবস্থিত রাজ্য ভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের এই সিদ্ধান্তে দ্য নিউ ইন্ডিয়া অ্যাস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডকে বাসমালিক জয়ারামকে বিমাকৃত মূল্যের ৭৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধের নির্দেশ বহাল থাকে। এর আগে যোধপুরের জেলা ভোক্তা কমিশন-২ বাসমালিকের অভিযোগ গ্রহণ করে এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন।
মামলার সূত্রপাত ২০১৯ সালের জুনে। অভিযোগ অনুযায়ী, বারমের থেকে হরিদ্বারের উদ্দেশে যাচ্ছিল পর্যটক বাসটি। পথে ফালসুন্দ এলাকার কাছে একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলচালকের মৃত্যু হলে ঘটনাস্থলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ জনতা বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে যানটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
দুর্ঘটনার পর বাসমালিক জয়ারাম বিমা কোম্পানিকে বিষয়টি জানান এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। বিমা কোম্পানির নিয়োগ করা একজন জরিপকারী ক্ষতিগ্রস্ত বাসটি পরিদর্শন করে সেটিকে ‘টোটাল লস’ বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত যান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেন। বিমার ক্ষেত্রে এ ধরনের মূল্যায়ন সাধারণত বোঝায়, যানটির ক্ষয়ক্ষতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সেটিকে সম্পূর্ণ ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে জরিপকারীর মূল্যায়ন সত্ত্বেও বিমা কোম্পানি ক্ষতিপূরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। তাদের অভিযোগ ছিল, বাসটি বিমা পলিসির শর্ত মেনে পরিচালিত হয়নি। কোম্পানির দাবি, পর্যটক পরিবহনের জন্য নির্ধারিত চুক্তিভিত্তিক যান হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে বাসটি নির্দিষ্ট রুটে যাত্রী পরিবহনকারী স্টেজ ক্যারেজের মতো পরিচালনা করা হয়েছিল। তাদের মতে, এ ধরনের ব্যবহার বিমা চুক্তির শর্তের লঙ্ঘন।
ভারতের পরিবহনব্যবস্থায় স্টেজ ক্যারেজ ও কন্ট্রাক্ট ক্যারেজের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। স্টেজ ক্যারেজ সাধারণত নির্দিষ্ট রুটে চলাচল করে এবং যাত্রীরা পথে বিভিন্ন স্থানে ওঠানামা করতে পারেন। অন্যদিকে, কন্ট্রাক্ট ক্যারেজ সাধারণত নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফলে কোনো যানবাহন অনুমোদিত ব্যবহারের বাইরে পরিচালিত হয়েছে কি না, তা বিমা দাবি নিষ্পত্তির সময় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
বিমা কোম্পানির দাবি প্রত্যাখ্যানের পর জয়ারাম জেলা ভোক্তা কমিশনের দ্বারস্থ হন। কমিশন তাঁর অভিযোগ পর্যালোচনা করে বিমাকৃত মূল্যের ৭৫ শতাংশ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে বাসমালিক পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁর দাবি ছিল, বাসটি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁকে বিমার পুরো অর্থ দেওয়া উচিত। সে কারণে তিনি পূর্ণ ক্ষতিপূরণের দাবিতে আপিল করেন।
অন্যদিকে, বিমা কোম্পানিও জেলা কমিশনের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ বাতিল করা। অর্থাৎ, এক পক্ষ ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়াতে চেয়েছিল, অন্য পক্ষ পুরো অর্থ পরিশোধের দায় এড়াতে চেয়েছিল।
রাজ্য কমিশনের শুনানিতে বাসমালিকের কাছে থাকা সর্বভারতীয় পর্যটক পারমিটের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই পারমিটের মাধ্যমে তিনি একটি দল বা দলের সদস্যদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহনের অনুমতি পেয়েছিলেন। বিমা কোম্পানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাসটির অনুমোদিত ব্যবহার এবং বাস্তবে যেভাবে এটি পরিচালিত হয়েছিল, সেই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল কি না, তা বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।
তবে জেলা ভোক্তা কমিশন বাসচালকের ভূমিকার বিষয়টিও বিবেচনা করেছিল। তাদের মূল্যায়নে, চালকের রাস্তার পাশ থেকে যাত্রী তোলার সিদ্ধান্ত দুর্ঘটনাসংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে অবদানমূলক অবহেলার প্রশ্ন তৈরি করে। এ কারণে বাসমালিককে পুরো বিমাকৃত অর্থ না দিয়ে ৭৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
রাজ্য ভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সভাপতি দেবেন্দ্র কাচ্ছাওয়া ও সদস্য লিয়াকত আলীকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ উভয় পক্ষের আপিল খারিজ করেন। ফলে জেলা কমিশনের দেওয়া ক্ষতিপূরণের নির্দেশ বহাল থাকে। বিমাকৃত মূল্য ৩৮ লাখ রুপি হওয়ায় এর ৭৫ শতাংশের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার রুপি।
এই ঘটনা বিমা দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যানবাহনের অনুমোদিত ব্যবহার, বিমা পলিসির শর্ত এবং দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে। কোনো যানবাহন সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিমার পুরো অর্থ পাওয়ার বিষয়টি সব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় নয়; দাবির শর্ত, প্রাসঙ্গিক তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে মামলাটি দেখায়, বিমা কোম্পানি পলিসির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললে সেই দাবি ভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে পর্যালোচিত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট নথি ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কমিশন ক্ষতিপূরণ আংশিকভাবে মঞ্জুর করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বাসমালিকের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আবেদন যেমন গ্রহণ করা হয়নি, তেমনি বিমা কোম্পানির ক্ষতিপূরণ বাতিলের আবেদনও খারিজ হয়েছে। ফলে দুই পক্ষের আপিল প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে আগের সিদ্ধান্তই চূড়ান্তভাবে বহাল রয়েছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।