ভোলার সদর উপজেলায় একটি সালিসে কথা-কাটাকাটির জেরে বিএনপির এক নেতাকে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এর পরপরই স্থানীয় লোকজনের পিটুনিতে মো. আসিফ (২৫) নামের বিএনপির এক কর্মী আহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়। শনিবার সন্ধ্যায় উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আসিফ রাজাপুর ইউনিয়নের একই এলাকার বাসিন্দা দুলু মিয়ার ছেলে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। অন্যদিকে ছুরিকাঘাতে আহত বিএনপি নেতা মো. হোসেন হাওলাদার ওরফে হোসেন ম্যানেজার (৫৫) রাজাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। তাঁকে প্রথমে ভোলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বরিশাল হয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হোসেন হাওলাদার ও আসিফের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ছিল। কয়েক দিন আগে আসিফকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় তাঁদের বিরোধ আরও বেড়েছিল বলে জানা গেছে। পরে একটি রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে যান হোসেন। সম্প্রতি দুজনই জামিনে মুক্তি পান।
শনিবার সন্ধ্যায় দুজনই রাজাপুর ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকায় যান। সেখানে একটি সালিস চলছিল। সালিসে বিএনপি নেতা হোসেনকে কথা বলতে দেখে আসিফ তাঁর সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আসিফ ধারালো অস্ত্র দিয়ে হোসেনকে ছুরিকাঘাত করেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এরপর তিনি ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।
ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন আহত হোসেনকে উদ্ধার করে ভোলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত পৌনে আটটার দিকে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রথমে বরিশালে এবং পরে ঢাকায় পাঠানো হয়।
এদিকে হোসেনের মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। স্থানীয় লোকজন আসিফকে আটক করে মারধর করেন বলে জানা গেছে। তবে হোসেনের মৃত্যুর খবরটি গুজব ছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানায়নি। মারধরের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আসিফকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত পৌনে নয়টার দিকে আসিফকে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার ভোররাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
ভোলা সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য মোহাম্মদ মামুন সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোকে বলেন, হোসেন হাওলাদারকে শনিবার রাত পৌনে আটটার দিকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালে পাঠানো হয়। আর আসিফকে রাত পৌনে নয়টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
রাজাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. শাহজাহান ব্যাপারী বলেন, বিএনপি নেতা হোসেনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন আসিফ। পরে আহত নেতাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর তিনি আসিফকে স্থানীয় লোকজনের মারধরের শিকার হওয়ার খবর পান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আসিফ বিএনপির কর্মী ছিলেন, তবে দলের কোনো পদে ছিলেন না।
ভোলা সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আসিফ ছুরিকাঘাত করেন। পরে তাঁকে মারধর করা হয়। ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। নিহত আসিফের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে।
ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। নিহতের মরদেহ নেওয়ার জন্যও কেউ আসেননি বলে তিনি জানিয়েছেন।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ছুরিকাঘাতের পর একজনের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা এবং সেই হামলায় তাঁর মৃত্যুর ঘটনা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঝুঁকিও সামনে এনেছে। কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের। একইভাবে ছুরিকাঘাতে আহত বিএনপি নেতার ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করা এবং পুরো ঘটনার পেছনের বিরোধ ও পরিস্থিতি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। আপাতত ছুরিকাঘাত ও পরবর্তী মারধরের ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে এলাকাটি।


