মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সরকারি পরিষেবার অবনতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ থেকেই এই আন্দোলনের বিস্তার ঘটেছে। গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে রাস্তায় নামতে দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার একদিকে নিরাপত্তা জোরদার করছে, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দাবির কিছু অংশ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে।
তবে সরকারি ঋণের বোঝা, বাজেট ঘাটতি এবং পার্লামেন্টে রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে জনঅসন্তোষ কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও ম্যাক্রোঁ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারফিউ জোরদার, বাড়ছে পুলিশের তৎপরতা
আগামী ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভ সামনে রেখে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ব্যাপকসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। এর আগে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্বীকার করেন, বিক্ষোভের ব্যাপকতা ও তীব্রতা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমান যথেষ্ট ছিল না। শনিবারের আন্দোলনে কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছে। বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। সহিংসতার মধ্যে মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরের একটি ঐতিহাসিক টাউন হলে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
রাজধানী প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আল শপিং এলাকায় রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছে। লিওঁসহ অন্যান্য শহরেও বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। সোমবার রাতে প্যারিস ও লিওঁতে বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া না গেলেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পুলিশি নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
রোববার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রোঁ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেন। তিনি জানান, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মপরিবেশের দাবিতে যারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছেন, তাদের বক্তব্য শুনতে সরকার প্রস্তুত। তবে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও অন্যান্য সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সরকারের এই অবস্থানের লক্ষ্য একদিকে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি পূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে বিক্ষোভের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট থেকে বৃহত্তর আন্দোলন
ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভের সূত্রপাত গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। প্যারিসের উপকণ্ঠে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা সমস্যা নিয়ে আন্দোলনে নামেন। শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ, জরাজীর্ণ ভবন এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অভাব ছিল তাদের প্রধান অভিযোগ।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের এসব দাবি শুরুতে শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা সমাধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের সঙ্গে আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে। বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরাও এতে যুক্ত হন। এর ফলে শিক্ষা খাতের সংকট নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ক্রমে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মপরিবেশ এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভের একটি বড় কারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় সামলানোর চাপ। জীবনযাত্রার খরচ বাড়লে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে শিক্ষা, পরিবহন ও অন্যান্য জনসেবায় ঘাটতি থাকলে সরকারের প্রতি অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। ফ্রান্সের বর্তমান আন্দোলনে এসব বিষয় একসঙ্গে সামনে এসেছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে। গত ৮ অক্টোবর দেশটির জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় সবচেয়ে বেশি শিক্ষকসংকটে থাকা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে তিন হাজারের বেশি বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। পাশাপাশি আরও কয়েক শ শিক্ষক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যার কতটা সমাধান করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষকসংকট দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতিতে বাড়ছে চাপ
জনঅসন্তোষ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ফ্রান্স সরকারকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বড় ধরনের আর্থিক চ্যালেঞ্জ। দেশটির সরকারি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় নতুন ব্যয় মেটানো এবং জনসেবার মান উন্নয়নে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সের জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের শেষে দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি ইউরোতে পৌঁছায়। এই ঋণ দেশটির বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১৯ শতাংশের সমান। অর্থাৎ, এক বছরে ফ্রান্স যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে, সরকারি ঋণের পরিমাণ তার চেয়েও বেশি।
চলতি বছর দেশটির বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সরকার। ২০২৭ সালে এই ঘাটতি কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর শুধু সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় ১২ বিলিয়ন ইউরো বেড়ে ৯১ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে। ঋণের সুদ পরিশোধে এত বিপুল অর্থ ব্যয় হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে নতুন করে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখানেই সরকারের সামনে বড় ধরনের নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে বিক্ষোভকারীদের দাবি পূরণে শিক্ষা ও জনসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যয় কমানোর চাপও রয়েছে। দুই দিক সামলাতে ব্যর্থ হলে অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক অসন্তোষ আরও গভীর হতে পারে।
পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কঠিন বাজেট পাস
ম্যাক্রোঁ সরকারের সংকট আরও জটিল করেছে পার্লামেন্টের রাজনৈতিক বিভক্তি। আইনসভায় প্রেসিডেন্টের মিত্রদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাজেট পাস করানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
চলতি বছরের বাজেট অনুমোদন পেতেও সরকারকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ভোট ছাড়াই বিশেষ সাংবিধানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে বাজেট কার্যকর করার উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে এই পদক্ষেপের কারণে মন্ত্রিসভাকে অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে পড়তে হয়। দুটি অনাস্থা প্রস্তাব টিকে গেলেও ঘটনাটি সরকারের রাজনৈতিক দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে।
বাজেট নিয়ে বিরোধের প্রভাব শুধু পার্লামেন্টের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা ও আর্থিক নীতির ওপর রাজনৈতিক ঐকমত্য না থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমানে বিক্ষোভকারীদের দাবির সঙ্গে সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার সংঘাত এই সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সংকট কাটাতে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ
ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনঅসন্তোষ প্রশমন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে। কেবল কারফিউ ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে তাৎক্ষণিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও আন্দোলনের পেছনে থাকা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো সমাধান করা আলাদা চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকসংকট, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগের কার্যকর সমাধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করাও কঠিন।
আগামী ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভ তাই ম্যাক্রোঁ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। ওই দিনের আন্দোলন কতটা শান্তিপূর্ণ থাকে এবং সরকার আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর পরবর্তী পরিস্থিতির গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।
ফ্রান্সের সামনে এখন মূল প্রশ্ন—নিরাপত্তা জোরদার করে সাময়িক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সরকার কি শিক্ষা, জনসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারবে? অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক বিভক্তির মধ্যে সেই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই ম্যাক্রোঁ প্রশাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


