সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদনটি জমা দেওয়া হয়। এতে কবরস্থানসংলগ্ন এলাকায় গানবাজনার আয়োজন হলে স্থানীয়দের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জগন্নাথপুর পৌর সদরের কেশবপুর বাজারসংলগ্ন কেশবপুর গ্রামেই মরমী সাধক কবি রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থল অবস্থিত। বাংলা লোকসংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব রাধারমণ দত্ত ধামাইল গানের স্রষ্টা হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর রচিত গান বাংলার লোকসংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। তাঁর স্মৃতি ও সংগীতচর্চাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর সমাধিস্থল এলাকায় বাউল গানের আসরের আয়োজন করা হয়।
আবেদনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কবরস্থানের পাশে কবি রাধারমণ দত্তের নাম ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি গানবাজনাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। তাঁদের বিবেচনায়, এ ধরনের আয়োজন কবরস্থানের পবিত্রতা ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট আয়োজন বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তাঁরা।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, কবরস্থানসংলগ্ন এলাকায় গানবাজনার আয়োজন করা হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। এর ফলে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ও শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আবেদনকারীরা।
আবেদনে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা কাদির মিয়া, রফিক মিয়া, মো. তৈয়মুছ আলী, আনকার মিয়া, খালেদ মিয়া, সোহেল মিয়া, মো. রফিকুল মিয়া, জাহাঙ্গীর মিয়া, আবু মিয়া, রফিক আলী, দিলা মিয়া, ওয়াহিদ মিয়া, এখলাক মিয়া, আবু তাহের, আওলাদ মিয়া ও তারেক মিয়াসহ অনেকে।
তবে বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের অবস্থান কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন জগন্নাথপুরের ইউএনও মো. ইসলাম উদ্দিন। মঙ্গলবার বিকেলে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, গানবাজনা পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য আবেদন করা হয়নি। বরং কেশবপুর গ্রামের কবরস্থানের পাশে যেন গানের আয়োজন না করা হয়, সে বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও বলেন, কবরস্থানের পবিত্রতা রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে কবি রাধারমণ দত্তের অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেবে, যাতে অনুষ্ঠানটি আরও সুন্দরভাবে এবং বৃহত্তর পরিসরে আয়োজন করা সম্ভব হয়।
প্রশাসনের এই বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, আপাতত পুরো আয়োজন বন্ধের পরিবর্তে অনুষ্ঠানস্থল ও আয়োজনের ধরন নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
দিরাইয়েও বাউল গানের আসর নিয়ে আপত্তি
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় বাউল গানের একটি আসর নিয়ে আপত্তির ঘটনা ঘটে। ‘গানের নামে অশ্লীলতা হতে পারে’—এমন আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি তোলেন স্থানীয় কয়েকজন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমে অনুষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সীমিত পরিসরে গান পরিবেশন করা হয় বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলীর বাড়িতে ওই গানের আসরের আয়োজন করা হয়েছিল। হাতিয়া গ্রামের পাশের তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রাম প্রয়াত বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের বাড়ির জন্যও পরিচিত।
আয়োজনে স্থানীয় দুই নারী শিল্পীর গান পরিবেশনের কথা ছিল। তবে বুধবার স্থানীয় দুই বাসিন্দা নারী শিল্পীদের গান গাওয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আয়োজন বন্ধের অনুরোধে দিরাই থানায় আবেদন করেন। পরে থানা-পুলিশ শওকত আলীর সঙ্গে কথা বললে তিনি গান হবে না বলে ঘোষণা দেন। যদিও শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার রাতে সীমিত পরিসরে গানের আয়োজন করা হয়।
দিরাই ও জগন্নাথপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে বাউল গান, নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ এবং ধর্মীয় অনুভূতি ও কবরস্থানের পরিবেশ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্নমতের বিষয়টি সামনে এসেছে। একদিকে লোকসংগীতের ঐতিহ্য ও সাধক-শিল্পীদের স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে কিছু বাসিন্দার ধর্মীয় ও সামাজিক আপত্তিও রয়েছে।
রাধারমণ দত্তের মতো লোকসংগীতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিকে ঘিরে আয়োজিত অনুষ্ঠান কীভাবে অব্যাহত রাখা যায়, একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া যায়—সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে আলোচনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।



