দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাম ও এর উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে এক হাজারের বেশি মানুষের শরীরে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৪৯ জনে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বিভাগে একজন করে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে এক দিনে মোট সাতজনের প্রাণহানি ঘটেছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১০৫ জন। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ১৪৪ জন। অর্থাৎ, মোট মৃত্যুর বড় অংশই ঘটেছে হামের উপসর্গ থাকা রোগীদের মধ্যে। তবে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সব ঘটনাকে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; রোগ নির্ণয় ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে নিশ্চিত সংক্রমণ নির্ধারণ করা হয়।
নতুন রোগী শনাক্তের পাশাপাশি বাড়ছে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হাম আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৬৯৫ জনে।
একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ২৫১ জন রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৫৭ জনে।
প্রতিবেদনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন রোগীর সংখ্যা সম্পর্কে দুটি আলাদা হিসাব দেওয়া হয়েছে। এক জায়গায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৩১৫ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ দেখা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য জায়গায় উপসর্গযুক্ত নতুন রোগীর সংখ্যা বলা হয়েছে ১ হাজার ২৫১। এই দুই সংখ্যার মধ্যে পার্থক্যের কারণ প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি। তাই আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর হিসাব আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হাসপাতালে ভর্তি দুই লাখের বেশি সন্দেহভাজন রোগী
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপের চিত্র উঠে এসেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম সন্দেহে ভর্তি হয়েছেন মোট ২ লাখ ১ হাজার ৪৬৮ জন।
একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩০১ জন। তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর সংখ্যার ব্যবধান থেকেই বর্তমানে হাসপাতালে ঠিক কতজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। এ জন্য নির্দিষ্ট দিনের ভর্তি, ছাড়পত্র ও মৃত্যুর হালনাগাদ হিসাব প্রয়োজন।
শিশুদের সুরক্ষা ও দ্রুত চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি ও শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়াতে পারে। বিশেষ করে টিকাবিহীন শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া এ রোগের সাধারণ লক্ষণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংক্রমণ নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিশুর শ্বাসকষ্ট, খেতে না পারা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, খিঁচুনি বা অস্বাভাবিক নিস্তেজ ভাব দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলে অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার আগে সম্ভব হলে স্বাস্থ্যকর্মীদের জানানোও গুরুত্বপূর্ণ।
হাম প্রতিরোধে টিকাদান সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকা দেওয়া এবং কোনো ডোজ বাদ পড়লে স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা জরুরি।
দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসাসেবা এবং টিকাদান কার্যক্রমের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত নজরদারি ও হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র মূল্যায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।


