বাংলা গানের ভুবনে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা কেবল কণ্ঠের মাধুর্যে শ্রোতার হৃদয় জয় করেন না; নিজেদের জীবন, আদর্শ, সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গীকার দিয়ে হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। কিংবদন্তি রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী কলিম শরাফী তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সুরের সাধনা, দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নাম তিনি।
তাঁর পুরো নাম মাখদুমজাদা শাহ সৈয়দ কলিম আহমেদ শরাফী। রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি দেশাত্মবোধক গানেও তিনি অর্জন করেছিলেন বিপুল জনপ্রিয়তা। তবে তাঁকে কেবল একজন সংগীতশিল্পীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। শিল্পের সাধনার পাশাপাশি মানুষের মুক্তি, অধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নেও ছিলেন আপসহীন।
১৯২৪ সালের ৮ মে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সিউড়ি সদর মহকুমার খয়রাদিহি গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা সামি আহমেদ শরাফী এবং মাতা আলিয়া বেগম। মাত্র চার বছর বয়সেই মাতৃহারা হন তিনি। শৈশবে আরবি শিক্ষার জন্য ওস্তাদজির কাছে এবং বাংলা শিক্ষার জন্য পণ্ডিত মশাইয়ের কাছে তাঁর হাতেখড়ি হয়।
রক্ষণশীল পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠলেও তাঁর মনন ও চিন্তার জগৎ ক্রমেই বিকশিত হয়েছিল উদার সাংস্কৃতিক চেতনায়। সংগীত, সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজভাবনা—সবকিছু মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল তাঁর স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব।
কলিম শরাফীর জীবন ছিল সংগ্রাম ও প্রতিবাদের এক দীর্ঘ ইতিহাস। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে কলকাতার হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন তিনি। কিশোর বয়সেই একটি স্কুল মিছিলের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে।
১৯৪২ সালে ব্রিটিশবিরোধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময় নিজ এলাকায় একটি সভায় সভাপতিত্ব করার কয়েক দিন পর ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া অ্যাক্টে তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাবাস কিংবা নির্যাতন—কোনো কিছুই তাঁর প্রতিবাদী চেতনাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তরে বাংলার পথে পথে যখন ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার, তখন তিনি সহশিল্পীদের নিয়ে গান গেয়ে গেয়ে দুর্গত মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। সংগীতকে তিনি শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের, মানবিক সংহতি প্রকাশের এবং সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ষাটের দশকে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিষেধাজ্ঞা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, কলিম শরাফী ছিলেন তার অন্যতম অগ্রণী সংগঠক ও কণ্ঠসৈনিক।
১৯৫৭ সালে ‘আকাশ আর মাটি’ চলচ্চিত্রে প্রথম নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন তিনি। কিন্তু ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রেডিওতে তাঁর গান সম্প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বহাল ছিল সেই নিষেধাজ্ঞা। অথচ কোনো নিষেধাজ্ঞাই তাঁর কণ্ঠের শক্তি কিংবা রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি ভালোবাসাকে স্তব্ধ করতে পারেনি।
চলচ্চিত্রের সঙ্গেও ছিল তাঁর নিবিড় সম্পৃক্ততা। ১৯৬২ সালে ‘সোনার কাজল’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। এতে অভিনয় করেন খলিল, সুলতানা জামান, পূর্ণিমা সেনগুপ্তা ও সুমিতা দেবী। চলচ্চিত্রটির সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। তাঁর সংগীত পরিচালনায় নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ‘সূর্যস্নান’ চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠে ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া রে’ গানটি সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। কবিয়াল রমেশ শীলের জীবন নিয়েও তিনি নির্মাণ করেছিলেন একটি তথ্যচিত্র।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে সংখ্যার চেয়ে গুণগত মান ও শৈল্পিক নিষ্ঠাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য পাঁচটি অ্যালবাম হলো—‘এই কথাটি মনে রেখো’, ‘আমি যখন তার দুয়ারে’, ‘কলিম শরাফীর যত গান’, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান’ এবং ‘নবজীবনের গান’—যার কথা ও সুরে ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র।
শুধু সংগীতের সাধনাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি এই শিল্পী। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ১৯৯২ সালের গণআদালতের আন্দোলনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। এ কারণে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখোমুখি হওয়াও তাঁর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
সংগীত ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার, নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, সত্যজিৎ রায় পুরস্কার এবং কৃতি বাঙালি সম্মাননাসহ নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন।
তাঁর কন্যা বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী আলিয়া শরাফী বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন এবং সেখানে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
২০১০ সালের ২ নভেম্বর এই মহান শিল্পী, সংগঠক ও সংস্কৃতিসাধক পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অনন্তলোকে পাড়ি জমান। আজ তাঁর প্রয়াণের আরও একটি বছর অতিক্রান্ত হলো। কিন্তু সময়ের প্রবাহে তাঁর কণ্ঠের আবেদন, তাঁর গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের মাধুর্য কিংবা তাঁর প্রতিবাদী জীবনের দীপ্তি এতটুকু ম্লান হয়নি।
কলিম শরাফী ছিলেন এমন এক শিল্পী, যাঁর কাছে গান ছিল ভালোবাসা, প্রতিবাদ ছিল দায়িত্ব, আর সংস্কৃতি ছিল মানুষের মুক্তির পথ। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান যেমন খুঁজে পেয়েছে অনন্য ব্যঞ্জনা, তেমনি তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, মানুষের পাশে থাকার মানবিকতা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার শিক্ষা।
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া সুর, সাধনা ও আদর্শ থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়ে। কলিম শরাফী তেমনই এক আলোকিত নাম। বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর গান, সংগ্রাম, চেতনা ও অসামান্য অবদানের মধ্য দিয়ে।
কিংবদন্তি এই শিল্পীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।


