কোনো কোনো কারখানায় এক দিনের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দুই থেকে তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, শিল্পাঞ্চলের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিহত তৌফিক শেখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ছয়ঘড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা তবিবুর রহমান তবি খান। তৌফিক গাজীপুর মহানগরীর বাংলাবাজার এলাকায় বসবাস করতেন এবং স্থানীয় লায়লা গার্মেন্টসে পোশাকশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি ওই এলাকায় থেকে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কাজ করছিলেন।
তৌফিকের স্বজনেরা জানান, গত সোমবার নোমান গ্রুপের টেরিটোরি গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকদের আন্দোলন চলছিল। এ সময় সেখানে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তৌফিক ঘটনাটি নিজের মুঠোফোনে ধারণ করার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা তাঁর ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে সহকর্মী শ্রমিকেরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে ঘটনার বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যে সংঘর্ষের একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, একটি কারখানা বন্ধ করার জন্য বহিরাগত কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করেন। কারখানা কর্তৃপক্ষ এতে রাজি না হওয়ায় বহিরাগতদের সঙ্গে কারখানার শ্রমিকদের সংঘর্ষ বাধে। এতে এক শ্রমিক গুরুতর আহত হন এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার সময় সেখানে পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না বলেও জানান তিনি। তবে তৌফিকের ওপর হামলার অভিযোগ এবং সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তদন্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা
তৌফিকের মৃত্যুর পাশাপাশি শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গাজীপুরের পোশাকশিল্প এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার রাতে অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণার খবর পাওয়া যায়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জারি করা নোটিশে উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর এলাকার কটন ক্লাব (বিডি) লিমিটেড ও কটন ক্লাউড (বিডি) লিমিটেড যৌথভাবে দুই দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠান দুটির নোটিশে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ ও বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা ও সার্বিক নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বুধবার ও বৃহস্পতিবার কারখানা দুটি বন্ধ থাকবে। তবে নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের কর্মীরা এ ছুটির আওতামুক্ত থাকবেন।
কালিয়াকৈর উপজেলার পূর্ব চন্দ্রা এলাকার লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড বুধবার এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের নোটিশ অনুযায়ী, ওই দিন সব শিফটের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বন্ধ থাকবে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) থেকে কারখানার সব শিফটের কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া এলাকার প্যানোরোমা অ্যাপারেলস লিমিটেড, কাশিমপুরের মিতালী ক্লাব ও জকি গার্মেন্টস তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। কোনাবাড়ীর জরুন এলাকার স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ, মনটেক্স ও ডিবিএল দুই দিনের জন্য কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার এপেক্স হোল্ডিং লিমিটেডও এক দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। একই এলাকার ইকোটেক্স লিমিটেড, কোকোলা ফুড প্রোডাক্ট, সাদমা ফ্যাশন, হাইড্রোক্সাইড লিমিটেড ও ইন্টারস্টফসহ অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মেয়াদে ছুটি দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবারের ছুটিতে মিলবে দীর্ঘ বিরতি
লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কারখানা দুই দিনের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পর শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় শ্রমিকেরা টানা তিন দিন কর্মবিরতি পাবেন। এই সময়ের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
কারখানা কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সংঘাত এড়ানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষ করে মজুরি কাঠামো নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে আলোচনার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পুলিশ
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত তাঁরা বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধের খবর পেয়েছেন। তবে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ কারখানা বন্ধ না রাখার ঘোষণা দিয়েছে বলেও তাঁরা জানতে পেরেছেন।
গাজীপুরের পোশাকশিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ অঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় কারখানাগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে মজুরি নিয়ে বিরোধ, কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে দ্রুত সমাধান না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনা শিল্পাঞ্চলের উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া, কারখানা কর্তৃপক্ষের অবস্থান এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে গাজীপুরের পোশাকশিল্প এলাকায় এখন স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।


