গত রোববার ব্রাজিলের মিনাস জেরাইস প্রদেশে মামোরেয়া ও উবেরলান্দিয়ার মধ্যে অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায়ের একটি সেমিফাইনাল ম্যাচে এই নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মামোরেয়া ৩-১ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর দুই দলের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি দুই দলের কর্মকর্তা ও কোচিং স্টাফরাও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন।
রেফারির দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘর্ষের পরবর্তী কয়েক মিনিটের মধ্যে মোট ৪০ জন খেলোয়াড় এবং দুই দলের আটজন স্টাফ সদস্যকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এর আগে ম্যাচের শুরুর দিকে আরও তিনজন ফুটবলার লাল কার্ড পেয়েছিলেন। পরে উবেরলান্দিয়ার পরিচালনা পর্ষদের দুজন সদস্যকেও বহিষ্কার করা হয়। সব মিলিয়ে বহিষ্কৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৩ জনে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় মামোরেয়ার তৃতীয় গোলের পর। গোল উদযাপনের সময় দলটির খেলোয়াড় দাভি প্রতিপক্ষ উবেরলান্দিয়ার বেঞ্চের দিকে গিয়ে উত্যক্তমূলক আচরণ করেন বলে রেফারির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উবেরলান্দিয়ার গোলকিপিং কোচ পাউলো সের্হিও দিয়াস দস সান্তোস মাঠে ছুটে এসে দাভির মুখোমুখি হন।
একপর্যায়ে দুজনের মধ্যকার উত্তেজনা দুই দলের অন্য খেলোয়াড়দের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় ব্যাপক মারামারি। পরিস্থিতি সামাল দিতে রেফারিকে একাধিকবার হস্তক্ষেপ করতে হয়। কিন্তু সংঘর্ষের ব্যাপকতা এতটাই বেশি ছিল যে, শেষ পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এ ঘটনায় ম্যাচটি প্রায় ৪০ মিনিট বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। রেফারি পরবর্তী প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করেন, সংঘর্ষের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁকে হত্যাসহ নানা ধরনের সহিংসতার হুমকি দিয়েছেন। এসব হুমকির ঘটনায় পরে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়।
মাঠের সংঘর্ষের রেশ খেলার পরও থামেনি। অভিযোগ ওঠে, উবেরলান্দিয়ার কর্মকর্তারা মামোরেয়ার সরঞ্জাম নষ্ট করেছেন। অন্যদিকে মামোরেয়ার দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে উবেরলান্দিয়ার স্বাগতিক দলের ড্রেসিংরুমে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগও সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের ফলাফল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে ঘটনার পর উবেরলান্দিয়া ক্লাব বুধবার জানায়, তারা সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে অংশ নেবে না। ক্লাবটির ভাষ্য, ‘ফেয়ার প্লে’ বা খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবের প্রতি সম্মান জানাতেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় বিপুলসংখ্যক খেলোয়াড় বহিষ্কৃত হওয়ায় দল গঠনের মতো পর্যাপ্ত উপযুক্ত ফুটবলারও তাদের হাতে নেই বলে জানানো হয়।
দ্বিতীয় লেগে উবেরলান্দিয়ার অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে মামোরেয়া।
ক্লাবটি আরও জানায়, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণভাবে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য, ক্রীড়াক্ষেত্রে উন্নতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত চরিত্র ও আচরণের উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ লাল কার্ড দেখানোর রেকর্ড ছিল আর্জেন্টিনার একটি ফুটবল ম্যাচের দখলে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটির পঞ্চম বিভাগের দুই দল অ্যাতলেতিকো ক্লেপোল ও ভিক্টোরিয়ানো আরেনাসের মধ্যকার ম্যাচে মোট ৩৬টি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। সেই রেকর্ডই এত দিন সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল।
ব্রাজিলের ম্যাচে ৫৩ জনকে বহিষ্কারের ঘটনায় আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে ১৭ জনের ব্যবধানে। তবে এই সংখ্যা শুধু মাঠে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কোচিং স্টাফ, কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাও এর অন্তর্ভুক্ত।
ফুটবলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে লাল কার্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। কিন্তু একটি ম্যাচে ৫৩ জনকে বহিষ্কারের ঘটনা খেলাটির স্বাভাবিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে তরুণ ফুটবলারদের একটি প্রতিযোগিতায় এমন সহিংসতার ঘটনা মাঠের শৃঙ্খলা রক্ষায় ক্লাব ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের বিষয়টিও সামনে এনেছে।


