ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের দায়ের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে এদিন ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যান পরীমনি। আগের দিন আদালত তার জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। সেই পরোয়ানার পরদিনই আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন তিনি।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর পর গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করছিলেন পরীমনি। এ সময় তাকে ঘিরে রাখেন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা। কালো পোশাক পরিহিত ১১ জন নিরাপত্তারক্ষীর পাশাপাশি সাধারণ পোশাকে আরও কয়েকজনকে তার আশপাশে দেখা যায়। তাদের উপস্থিতিতে আদালত প্রাঙ্গণে সাধারণ মানুষের চলাচলও কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।
পরীমনির আদালতে আসার খবর পেয়ে সকাল থেকেই সেখানে ভিড় করেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা। ছবি ও ভিডিও ধারণের জন্য তারা অপেক্ষা করছিলেন। সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে গাড়ি থেকে নেমে এজলাসের দিকে যেতে শুরু করেন পরীমনি। এ সময় তার নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখেন। সাংবাদিকেরা ছবি ও ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে তাদের ধাক্কাধাক্কি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
লিফটে ওঠার সময় ভিডিও ধারণ করতে গেলে সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইনের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন পরীমনি। পরে রবিউল টান দিয়ে ফোনটি নিজের কাছে ফিরিয়ে নেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়।
এরপর পরীমনি ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এ যান। ভারপ্রাপ্ত বিচারক মাহফুজুর রহমানের আদালতে তার জামিনের আবেদন শুনানি হয়। শুনানির একপর্যায়ে আদালতের বেঞ্চে বসে থাকা পরীমনি আসামির কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান। তার পক্ষে আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভী জামিনের আবেদন জানিয়ে শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত ৫০০ টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন।
জামিন পাওয়ার পর আদালত থেকে বের হওয়ার সময়ও পরীমনিকে ঘিরে রাখেন তার নিরাপত্তারক্ষীরা। সাংবাদিকেরা ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে আবারও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় নিরাপত্তারক্ষীদের ধাক্কায় আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সুজন চন্দ্র মনি দাস নামে এক বিচারপ্রার্থীর মাথা ফেটে যায়। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরতে দেখা যায়।
আহত সুজনের ভাই অভিযোগ করে বলেন, তারা আদালতে একটি কাজে এসেছিলেন এবং বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় পরীমনির নিরাপত্তারক্ষীদের ধাক্কায় তার ভাইয়ের মাথা ফেটে যায়। তিনি বলেন, “নায়িকা পরীমনির নিরাপত্তারক্ষীরা ধাক্কা দিয়ে আমার ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।” তবে তিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
এদিকে আদালতের নিচে নেমে গাড়িতে ওঠার আগে সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইনকে দেখে তার দিকে তেড়ে যান পরীমনি। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের গালিগালাজ করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরে তিনি গাড়িতে উঠে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন।
পরীমনির নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে আরও কয়েকজন সাংবাদিককে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পরীমনির বক্তব্য জানা যায়নি। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
মামলার পটভূমি
ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ ২০২২ সালের ৬ জুলাই পরীমনি ও তার বিরুদ্ধে মারধর, ভাঙচুর এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন।
২০২৩ সালের ১৮ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পরিদর্শক মনির হোসেন আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনে পরীমনি ও তার কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
একই বছরের ১৮ এপ্রিল আদালত দুই আসামিকে ২৫ জুন হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করেন। নির্ধারিত দিনে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান তারা।
পরবর্তী সময়ে গত বছরের ২৬ জানুয়ারি পরীমনি ও জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার তৎকালীন জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জুনাইদ। ওই দিন পরীমনি আদালতে উপস্থিত না থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তবে পরোয়ানা জারির পরদিনই আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান তিনি।
এরপর ২৭ মার্চ অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে রিভিশন আবেদন করেন পরীমনি। গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকার নবম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সাজ্জাদুর রহমান খান সেই আবেদন খারিজ করে দেন। আদালতের আদেশে মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলতে আর কোনো বাধা নেই বলে জানানো হয়।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলায় বৃহস্পতিবারের শুনানি ও জামিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিচারপ্রার্থী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের আচরণ এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।


