বাংলা গানের ভুবনে কিছু কণ্ঠ থাকে, যাদের আবেদন কখনো ফুরিয়ে যায় না। সময়ের স্রোত বয়ে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠের মায়া থেকে যায় মানুষের হৃদয়ের গভীরে। এন্ড্রু কিশোর তেমনই একজন কালজয়ী শিল্পী। বাংলা চলচ্চিত্রের গানে যাঁর কণ্ঠ একসময় হয়ে উঠেছিল আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না আর জীবনের নানা অনুভূতির অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। তিনি শুধু একজন কণ্ঠশিল্পী নন, তিনি বাংলাদেশের সংগীতজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কোটি শ্রোতার ভালোবাসায় অভিষিক্ত ‘প্লেব্যাক সম্রাট’।
১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন এন্ড্রু কিশোর। তাঁর পুরো নাম এন্ড্রু কিশোর কুমার বাড়ৈ। বাবা ক্ষীতিশ চন্দ্র বাড়ৈ এবং মা মিনু বাড়ৈ। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। মাত্র ছয় বছর বয়সে রাজশাহীর প্রখ্যাত সংগীতগুরু ওস্তাদ আবদুল আজিজ বাচ্চুর কাছে সংগীতের হাতেখড়ি। তাঁর কাছে সুরের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণের মধ্য দিয়েই শুরু হয় সংগীতের দীর্ঘ অভিযাত্রা।
১৯৬২ সালে শিশু শিল্পী হিসেবে রাজশাহী বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, আধুনিক, লোকসংগীত ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করতেন। সংগীতের প্রায় সব ধারায় ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ।
পরবর্তী সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তাঁর হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিল সংগীত।
চলচ্চিত্রের গানে এক অবিস্মরণীয় যাত্রা
১৯৭৭ সাল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। সংগীত পরিচালক আলম খানের সুরে ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রের ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ গানটির মাধ্যমে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এন্ড্রু কিশোর।
এরপর ১৯৭৯ সালে পরিচালক এ জে মিন্টুর ‘প্রতিজ্ঞা’ চলচ্চিত্রে ‘এক চোর যায় চলে এ মন চুরি করে’ গানটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম অপরিহার্য কণ্ঠ।
১৯৭৭ থেকে ২০২০—দীর্ঘ ৪৩ বছরের সংগীতজীবনে অসংখ্য চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। তাঁর কণ্ঠে প্রাণ পেয়েছে হাজার হাজার গান। প্রেমিকের আকুলতা, বিরহীর হাহাকার, জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, মাটির মানুষের সুখ-দুঃখ—সবকিছুই যেন অনন্য দক্ষতায় ধারণ করেছিলেন তাঁর কণ্ঠে।
‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘আমার বুকের মধ্যিখানে’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘তুমি যেখানে আমি সেখানে’, ‘বেদের মেয়ে জোছনা আমায় কথা দিয়েছে’—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গান আজও শ্রোতাদের আবেগাপ্লুত করে।
তাঁর কণ্ঠের বিশেষত্ব ছিল গভীরতা, দরদ, আবেগ এবং অসাধারণ অভিব্যক্তি। গানের কথার অন্তর্নিহিত অনুভূতিকে কণ্ঠের মাধুর্যে জীবন্ত করে তুলতে পারতেন তিনি। তাই পর্দায় নায়কের ঠোঁটে তাঁর গান বেজে উঠলে দর্শক-শ্রোতারা ভুলে যেতেন যে এটি নেপথ্যের কণ্ঠ। মনে হতো, চরিত্রটির হৃদয়ের কথাই যেন উচ্চারিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। ভারতীয় কিংবদন্তি সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মণের সুরেও গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর।
পুরস্কার ও অর্জন
দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আটবার অর্জন করেছেন বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী বিভাগে। ১৯৮২ সালে ‘বড় ভালো লোক ছিল’ চলচ্চিত্রের ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’ গানের জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
পরবর্তী সময়ে ‘সারেন্ডার’, ‘ক্ষতিপূরণ’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘কবুল’, ‘আজ গায়ে হলুদ’, ‘সাজঘর’ ও ‘কী জাদু করিলা’ চলচ্চিত্রের গানের জন্যও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন।
আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন নিঃসন্দেহে তাঁর সংগীতপ্রতিভা ও কর্মনিষ্ঠার এক অনন্য স্বীকৃতি। তবে কোনো পুরস্কার কিংবা পদক দিয়ে এন্ড্রু কিশোরের প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব নয়। মানুষের হৃদয়ে তাঁর যে স্থায়ী আসন, সেটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
ব্যক্তিজীবন ও শেষ অধ্যায়
ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী লিপিকা এন্ড্রু এবং দুই সন্তান সংজ্ঞা ও সপ্তককে নিয়ে ছিল তাঁর সাজানো সংসার। পেশাগত জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবার ছিল তাঁর ভালোবাসা ও নির্ভরতার প্রধান আশ্রয়।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে দুরারোগ্য নন-হজকিনস লিম্ফোমা ক্যানসারে আক্রান্ত হন এই কিংবদন্তি শিল্পী। দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা গ্রহণের পর দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ২০২০ সালের ৬ জুলাই রাজশাহীতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মাত্র ৬৪ বছর বয়সে থেমে যায় বাংলা গানের এক অসাধারণ কণ্ঠের পার্থিব পথচলা।
তাঁর গাওয়া একটি গানের কলি আজ যেন তাঁর নিজের জীবনকাহিনিরই এক বিষণ্ন প্রতিধ্বনি—
‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প।’
সত্যিই, জীবনের আরও কত গল্প হয়তো বলার ছিল, কত গান হয়তো গাওয়ার ছিল, কত সুর হয়তো এখনো জন্ম নেওয়ার অপেক্ষায় ছিল! কিন্তু সেই গল্পের অনেকখানিই অপূর্ণ রেখে তিনি চলে গেছেন না-ফেরার দেশে।
তবে শিল্পীর মৃত্যু হয়, শিল্পের নয়। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু ঘটে না। এন্ড্রু কিশোরও তাই আমাদের কাছে কেবল অতীতের কোনো স্মৃতিময় নাম নন; তিনি আমাদের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী, আমাদের আবেগের অনিবার্য অংশ।
যত দিন বাংলা চলচ্চিত্রের গান থাকবে, যত দিন মানুষের হৃদয়ে প্রেম, বিরহ আর জীবনের গল্প বেঁচে থাকবে, তত দিন এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠও বেঁচে থাকবে অমর সুরের মূর্ছনায়।
বাংলা গানের আকাশে আপনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন এক অনিঃশেষ নক্ষত্র হয়ে।
কিংবদন্তি এই শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র স্মরণ।


