এ ঘটনায় মাদুপোজু কর্ণাকার, চিন্নোল্লা মানিক্য রেড্ডি, চেরুকুপেল্লি রত্নাকর রেড্ডি ও করণম অজয় কুমারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। চক্রটির সঙ্গে জড়িত আরও তিনজন পলাতক রয়েছেন। তাঁদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
অভিযানে সব মিলিয়ে ৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা মূল্যের জাল নোট উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি জাল মুদ্রা তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর হায়দরাবাদের রামোজি ফিল্ম সিটির কাছে ৬৫ নম্বর জাতীয় সড়কে একটি গাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। আবদুল্লাপুরমেট থানার পুলিশ এবং শাদনগর বিশেষ অভিযান দলের সদস্যরা যৌথভাবে ওই অভিযান পরিচালনা করেন। তল্লাশির সময় গাড়ি থেকে ৫০০ টাকার জাল নোটের আট লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ সময় গাড়িতে থাকা চারজনকে আটক করে পুলিশ।
পরে গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জাল নোট তৈরির কারখানার সন্ধান মেলে। হায়দরাবাদের উপকণ্ঠে কুন্টলুর এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে গোপনে পরিচালিত হচ্ছিল কারখানাটি। সেখানে অভিযান চালিয়ে আরও ১৩৪ বান্ডিল ৫০০ টাকার জাল নোট উদ্ধার করেন তদন্তকারীরা। এসব নোটের আনুমানিক মূল্য ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
গাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া আট লাখ টাকার সঙ্গে কারখানা থেকে জব্দ করা জাল নোট মিলিয়ে মোট উদ্ধার করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
কারখানাটিতে জাল নোট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু সরঞ্জামও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রঙিন মুদ্রণযন্ত্র, স্ক্যানার, বহনযোগ্য কম্পিউটার, লেমিনেশন মেশিন এবং নোট কাটার বিভিন্ন উপকরণ। এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে কীভাবে জাল নোট তৈরি ও প্রস্তুত করা হতো, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
ফিউচার সিটি পুলিশের কমিশনার তরুণ যোশী জানান, চক্রটির মূল অভিযুক্ত মাদুপোজু কর্ণাকার ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও দেখে জাল নোট তৈরির পদ্ধতি শিখেছিলেন। পরে সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ভাড়া বাড়িতে জাল নোট ছাপানোর কার্যক্রম শুরু করেন। ধীরে ধীরে এতে অন্যদেরও যুক্ত করেন তিনি।
তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, চক্রটির ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ছিল বেশ বড়। এক লাখ টাকা আসল নগদ অর্থের বিনিময়ে তিন থেকে চার লাখ টাকার জাল নোট সরবরাহের প্রস্তাব দিত তারা। অর্থাৎ, তুলনামূলক কম দামে বিপুল পরিমাণ জাল টাকা পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করত চক্রটি।
তবে এই প্রস্তাবে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় তারা প্রতারণার ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। পুলিশের দাবি, সম্ভাব্য ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রথমে তাঁদের কিছু আসল টাকা দেখানো হতো। এরপর নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তাঁদের কাছ থেকে আসল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো।
এ ধরনের প্রতারণা কার্যক্রমে চক্রটির সদস্যরা ভুয়া পরিচয়পত্র, ওয়াকিটকি, নকল আগ্নেয়াস্ত্র এবং জাল নম্বর প্লেটযুক্ত গাড়ি ব্যবহার করত বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে উপস্থাপন করে ভুক্তভোগীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করা হতো।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এভাবে পৃথক দুটি ঘটনায় দুই সম্ভাব্য ক্রেতার কাছ থেকে যথাক্রমে দুই লাখ ও তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে। অর্থাৎ, জাল নোট বিক্রির প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে প্রতারণার পাশাপাশি পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করেও অর্থ আত্মসাৎ করছিল তারা।
পুলিশ এখন পলাতক তিন সদস্যের অবস্থান শনাক্তের পাশাপাশি চক্রটির সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখছে। উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ জাল নোট কোথায় সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল এবং এর আগে বাজারে কোনো জাল নোট ছড়ানো হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
জাল মুদ্রা শুধু আর্থিক প্রতারণার বিষয় নয়; এটি দেশের মুদ্রাব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে বাজার, দোকানপাট ও নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে জাল নোট শনাক্ত করা কঠিন হলে সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। এ কারণে এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান এবং জাল মুদ্রার উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।


