কোরিয়া হেরাল্ডের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গত ২৮, ৩০ ও ৩১ অক্টোবর ব্রাজিলের সাও পাওলোর মোরুম্বি স্টেডিয়ামে তিনটি কনসার্টের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকা সফরের ইতি টানে বিটিএস। এর আগে গত ২ অক্টোবর কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা থেকে শুরু হয়েছিল তাদের এই সংগীতযাত্রা। এরপর পর্যায়ক্রমে পেরুর লিমা, চিলির সান্তিয়াগো এবং আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে কনসার্ট করে দলটি। প্রতিটি শহরেই ভক্তদের ব্যাপক উপস্থিতি এবং উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
এবারের পরিবেশনায় বিটিএস তাদের পঞ্চম অ্যালবাম ‘অ্যারিরাং’-এর গানগুলোর পাশাপাশি ভক্তদের পরিচিত ও জনপ্রিয় বেশ কিছু গান পরিবেশন করে। তালিকায় ছিল ‘ফেক লাভ’, ‘নট টুডে’, ‘মাইক ড্রপ’, ‘ফায়ার’, ‘আইডল’, ‘বাটার’ এবং ‘ডাইনামাইট’। নতুন ও পুরোনো গানের সমন্বয়ে সাজানো পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে বাড়তি উন্মাদনা তৈরি করে।
সংগীতের পাশাপাশি এবারের সফরে সদস্যদের পোশাক ও মঞ্চসজ্জায়ও ছিল স্থানীয় সংস্কৃতির ছাপ। ব্রাজিলে পরিবেশনার সময় সদস্যরা দেশটির ফুটবল জার্সি পরে মঞ্চে ওঠেন। জিন ও আরএমের মাথায় দেখা যায় ব্রাজিলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী পালকের মুকুট। স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন ভক্তদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করে।
সাও পাওলোর শেষ কনসার্টে দক্ষিণ আমেরিকার দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান দলের সদস্য জে-হোপ। তিনি বলেন, দক্ষিণ আমেরিকা তাদের কাছে সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সফরগুলোর একটি ছিল। এই অঞ্চলে নিয়মিত আসার সুযোগ না হওয়ায় ভক্তদের সঙ্গে দেখা করার জন্য তারা আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন। তবে দর্শকদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সমর্থন তাদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সফর শেষে আবারও দক্ষিণ আমেরিকায় ফেরার আশাবাদ জানিয়েছেন দলের সদস্যরা। শনিবার উইভার্সে সরাসরি সম্প্রচারে জিমিন বলেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার জন্য ভক্তদের ধন্যবাদ। পুরো সফরটি তাদের জন্য আনন্দের ছিল এবং দক্ষিণ আমেরিকার অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন স্মৃতিতে থাকবে। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে এত মানুষের ভালোবাসা পাওয়া এখনো তাকে বিস্মিত করে। এই অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়েই তারা পরবর্তী প্রস্তুতি নেবেন এবং আবারও এই অঞ্চলে ফিরে আসবেন।
দক্ষিণ আমেরিকায় ঐতিহাসিক সফর
এবারের সফর বিটিএসের জন্য কয়েকটি দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কলম্বিয়া ও আর্জেন্টিনায় এটিই ছিল দলটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ কনসার্ট। একই সঙ্গে অভিষেকের পর প্রথমবারের মতো পেরুতে সংগীত পরিবেশন করেছে তারা। অন্যদিকে চিলিতে দীর্ঘ নয় বছর এবং ব্রাজিলে সাত বছর পর কনসার্ট করেছে জনপ্রিয় এই দল।
বিটিএসের আগমনকে কেন্দ্র করে কনসার্টের বাইরেও বিভিন্ন শহরে নানা আয়োজন করা হয়। বোগোতা ও বুয়েনস এইরেসে দলটির সাংস্কৃতিক প্রভাবের স্বীকৃতিস্বরূপ সদস্যদের সম্মানিত অতিথি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে সাময়িকভাবে একটি সড়কের নাম রাখা হয় ‘অ্যাভেনিদা বিটিএস’। এ ছাড়া শহরটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিটিএসের প্রতীকী রং বেগুনিতে আলোকিত করা হয়।
এসব আয়োজন থেকে বোঝা যায়, দলটির জনপ্রিয়তা কেবল সংগীতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাদের প্রভাব, সাংস্কৃতিক পরিচিতি এবং আন্তর্জাতিক ভক্তসমাজের ব্যাপ্তিও ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব
বিটিএসের কনসার্ট ঘিরে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন শহরে পর্যটন, পরিবহন, আবাসন ও খাবারের ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য চাহিদা তৈরি হয়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের কাছের শহর লা প্লাতায় এর অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল বেশ স্পষ্ট।
স্থানীয় একটি জরিপে দেখা গেছে, সেখানে কনসার্ট দেখতে আসা দর্শকদের ৯৬ শতাংশই ছিলেন শহরের বাইরের। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষের জন্য লা প্লাতা সফর ছিল প্রথমবারের অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া ৪৮ হাজারের বেশি দর্শনার্থী শহরটিতে অন্তত এক রাত অবস্থান করেন।
টিকিটের মূল্য বাদ দিয়ে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও বিনোদন খাতে এসব দর্শনার্থীর মোট ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ৫ হাজার ৩০০ কোটি আর্জেন্টাইন পেসো। মার্কিন মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, বড় পরিসরের আন্তর্জাতিক সংগীত আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যান্য শহরেও কনসার্টকে কেন্দ্র করে যাতায়াত ও আবাসনসেবার চাহিদা বেড়েছে। বোগোতায় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ফ্লাইট বুকিং বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ। পেরুর লিমায় বিটিএসের প্রথম কনসার্টের দিন রাইড শেয়ারিং সেবার চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১৫ গুণ বেড়ে যায়। কনসার্ট শেষ হওয়ার পর এই চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ গুণে।
চিলির সান্তিয়াগোতেও আবাসন খোঁজার হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এসব পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, বিটিএসের মতো আন্তর্জাতিক তারকাদের কনসার্ট শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, বরং পর্যটন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এবার এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় সফরের প্রস্তুতি
দক্ষিণ আমেরিকার সফল সফর শেষ করে এবার এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মঞ্চে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিটিএস। আগামী ১৯ নভেম্বর তাইওয়ানের কাওশিয়ুং শহরে শুরু হবে এই পর্বের কনসার্ট।
এরপর ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় সংগীত পরিবেশন করবে দলটি। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও সিডনিতেও তাদের কনসার্ট করার কথা রয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকায় ১৪টি কনসার্টে ৮ লাখ ৫৩ হাজার দর্শকের উপস্থিতি বিটিএসের আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় প্রমাণ। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও সংগীতপ্রেমীদের সঙ্গে তাদের সংযোগ আরও দৃঢ় হয়েছে। এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার আসন্ন কনসার্টগুলোতেও ভক্তদের মধ্যে একই ধরনের উন্মাদনা দেখা যাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



