খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৫
হাঙ্গেরিতে জনসমক্ষে এলজিবিটিকিউ প্লাস গোষ্ঠীর অনুষ্ঠান—যেমন গৌরব পদযাত্রা (প্রাইড প্যারেড)—নিষিদ্ধে সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। সমালোচক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত হাঙ্গেরির ক্ষমতাসীন জনপ্রিয়তাবাদী সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার আরেকটি বহিঃপ্রকাশ।
সোমবার (৮ এপ্রিল) হাঙ্গেরির পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে ১৪০টি ভোট পক্ষে ও ২১টি ভোট বিপক্ষে পড়ে। সাংবিধানিক সংশোধনী পাসের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন ছিল। প্রস্তাবটি উত্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান নেতৃত্বাধীন শাসক জোট ‘ফিদেজ-কেডিএনপি’।
ভোট গ্রহণের আগে বিরোধী দল ও বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবনের একটি প্রবেশপথ অবরোধের চেষ্টা করেন। তাদেরকে সরিয়ে দেয় পুলিশ। অনেক বিক্ষোভকারী প্লাস্টিকের টাই দিয়ে নিজেদের হাত বেঁধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করেন। ভোট চলাকালে বিরোধী সংসদ সদস্যরা এয়ার হর্ন বাজিয়ে প্রতিবাদ জানান, তবে কিছু সময় পর আবার ভোট গ্রহণ শুরু হয়।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, “শিশুদের নৈতিক, শারীরিক ও আত্মিক বিকাশের অধিকার—জীবনের অধিকারের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি তা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার থেকেও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।”
এর অর্থ, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অজুহাতে এখন সরকার এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের জনসমাবেশ বা অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করতে পারবে। এর আওতায় পড়বে প্রাইড প্যারেডের মতো অনুষ্ঠানও।
এছাড়া, সংশোধনীতে সংবিধানিকভাবে স্বীকৃত লিঙ্গের সংখ্যা নির্ধারণ করে বলা হয়েছে—পুরুষ ও নারী—এই দুইটি লিঙ্গই কেবল আইনগত স্বীকৃতি পাবে। এর ফলে ট্রান্সজেন্ডার বা নন-বাইনারি পরিচয় সাংবিধানিকভাবে অস্বীকৃত হয়ে যায়।
নতুন আইনে আরও বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করতে কর্তৃপক্ষ ফেশিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে, সর্বোচ্চ ২ লাখ হাঙ্গেরিয়ান ফোরিন্ট (প্রায় ৫৪৬ ডলার) পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যক্তি গোপনীয়তার অধিকারে ব্যাপক হস্তক্ষেপ ঘটাবে। হাঙ্গেরিয়ান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের আইনজীবী আদাম রেমপোর্ট বলেন, “একটি জনসমাবেশে ফেশিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির প্রয়োগ ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় গভীর প্রভাব ফেলে।”
সংশোধনীতে আরও একটি নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে—যদি ইউরোপীয় ইকোনমিক জোনের বাইরের কোনো দেশে দ্বৈত নাগরিকত্বধারী হাঙ্গেরিয়ান কোনো ব্যক্তি জনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়, তবে তার নাগরিকত্ব ১০ বছর পর্যন্ত স্থগিত করা যেতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এসব পদক্ষেপ শিশুদের “জেন্ডার বিভ্রান্তি” থেকে রক্ষা করতে এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, আসলে এসব হচ্ছে রাজনৈতিক চমক—নির্বাচনের আগে ডানপন্থি ভোটারদের মন পেতে এবং দেশের বাস্তব সংকট থেকে দৃষ্টি সরাতেই এইসব কৌশল।
মোমেন্টাম পার্টির সংসদ সদস্য দাভিদ বেদো বলেন, “গত ১৫ বছর ধরে ভিক্টর অরবান ও ফিদেজ সরকার হাঙ্গেরির গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ভেঙে দিচ্ছে। সম্প্রতি তা আরও দ্রুত হচ্ছে।”
হাঙ্গেরিয়ান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের আইনজীবী ড্যানেল ড্যাব্রেন্টে আরও বলেন, “এই আইন নিছক প্রপাগান্ডা। শিশুদের অধিকারের সঙ্গে এর কোনো বাস্তব সম্পর্ক নেই।”
প্রাইড প্যারেড বা গৌরব পদযাত্রা মূলত এলজিবিটিকিউ সংস্কৃতি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার একধরনের উৎসব ও প্রতিবাদ একসঙ্গে। এটি প্রায়শই সমকামী বিবাহসহ নানা সামাজিক-আইনি বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আধুনিক এলজিবিটিকিউ আন্দোলনের অন্যতম ঐতিহাসিক ঘটনা ‘স্টোনওয়াল বিদ্রোহ’ স্মরণে প্রতিবছর জুন মাসে বহু দেশে প্রাইড প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়।
হাঙ্গেরির এই নতুন সাংবিধানিক সংশোধনীর ফলে দেশটিতে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের অধিকার আরও সংকুচিত হলো বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। আন্তর্জাতিক মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইন শুধুমাত্র একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ নয়, বরং এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলবে।
সূত্র: সিএনএন
খবরওয়ালা/জেআর