খবরওয়ালা মফস্বল ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৫
আগামীকাল ২৭ এপ্রিল, নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ১১ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০১৪ সালের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড সারাদেশে তীব্র আলোড়ন তোলে। তবে এত বছর পরও বিচারপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি। মামলাটি এখনও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঝুলে রয়েছে।
নিম্ন আদালত ২০১৭ সালে এবং উচ্চ আদালত ২০১৮ সালে রায় দিলেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। ফলে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও মানবেতর জীবনের মধ্যে দিয়ে দিন পার করছেন নিহতদের স্বজনরা।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আসামিদের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ২২ আগস্ট হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দেন।
মামলার বাদী নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন,”এই মামলা সারাদেশের আলোচিত একটি মামলা। আমরা বারবার সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছি। আজ ১১ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও আমরা বিচার দেখতে পাইনি। আপিল বিভাগে মামলাটি ঝুলে আছে। আমাদের একটাই দাবি—রায় দ্রুত কার্যকর করা হোক।”
নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী সামসুন নাহার বলেন,”আমার মেয়ে রওজা মনির জন্ম হয় জাহাঙ্গীর নিহতের দুই মাস দশ দিন পর। সে বাবা বলে ডাকতে পারেনি। এখনো আমরা মা-মেয়ে অপেক্ষা করছি, এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার দেখার জন্য।”
তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বলেন,”আমার ছেলে ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার আয়ে সংসার চলত। আমি চাই, হত্যাকারীদের ফাঁসি দ্রুত কার্যকর হোক।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন,“গত দশ বছরে মামলার দুটি ধাপ শেষ হয়েছে। এখন শুধু আপিল বিভাগের রায় কার্যকর হওয়া বাকি। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। এতে স্বজনহারা পরিবারগুলোর ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।”
জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির জানান,“আমরা বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে বারবার কথা বলেছি। তিনিও মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। আইন মন্ত্রণালয় থেকেও আশ্বস্ত করা হয়েছে, আসামিরা কোনো সুযোগ নিতে পারবে না।”
ঘটনার বিবরণ
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে মামলায় হাজিরা দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পশ্চিমপাড়া এলাকার নিজ বাসভবনে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমানী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে অপহরণ হন সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র ও ২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার, নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, জাহাঙ্গীর আলম ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক মো. ইব্রাহীম। পরে ৩০ এপ্রিল ও ১ মে একে একে সাতজনের মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠে।
হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ১৫ জন:
র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক তারেক সাঈদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (চাকরিচ্যুত) এম মাসুদ রানা, সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন,র্যাব সদস্য বেলাল হোসেন, এমদাদুল হক, আরিফ হোসেন, হিরা মিয়া, আবু তৈয়ব আলী, শিহাব উদ্দিন, পূর্ণেন্দু বালা, আবদুল আলিম, মহিউদ্দিন মুনশি, আল আমিন ও তাজুল ইসলাম
যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ১১ জন:
সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর,সার্জেন্ট এনামুল কবির,আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান, রহম আলী, আবুল বাশার,মোর্তুজা জামান, সেলিম, সানাউল্লাহ, শাহজাহান, জামালউদ্দিন
বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত ৯ জন:
কনস্টেবল হাবিবুর রহমান (১৭ বছর) এএসআই আজাদ, কামাল হোসেন,কনস্টেবল বাবুল, করপোরাল মোখলেসুর, রুহুল আমিন,সিপাহি নুরুজ্জামান (সকলের ১০ বছর) ও এএসআই বজলুর, হাবিলদার নাসির (৭ বছর)
পলাতক ৫ আসামি:
সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম, নূর হোসেনের সহকারী সানাউল্লাহ ও ম্যানেজার শাহজাহান।
পরিবারগুলো এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি—এত বড় একটি মামলার বিচার ঝুলে থাকা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তারা দ্রুত এই মামলার চূড়ান্ত রায় কার্যকরের আহ্বান জানিয়েছেন।
খবরওয়ালা/এমবি