বগুড়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ মে ২০২৫
শাঁওল গ্রামে ঢুকলেই চারিদিক থেকে ছন্দময় খট খট শব্দের ঝংকার কানে আসে। সব সময় এই খটরমটর ছন্দে মুখরিত থাকে গ্রাম। গ্রামের মেঠো পথ ধরে গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী নারী-পুরুষের হাতেই রয়েছে সুতা। কেউ চরকায় সুতা কাটছেন, কেউ তাঁতের কলে কাজ করছেন। গ্রামের লোকেরা সব সময় ব্যস্ত। এমনই ব্যস্তময় তাতিপাড়ার দেখা মিলবে ‘বগুড়ার চাদর কম্বল গ্রামে’ গেলে।
বগুড়া শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে সান্তাহার-বগুড়া সড়কের মুরইল থেকে ৪ কিলোমিটার উত্তরে এই হাট ও কম্বল গ্রাম। বাংলাদেশের তাঁত শিল্পের অন্যতম ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত এই গ্রাম।
শাঁওইল বাজার থেকে তাঁতিপল্লী এখন ছড়িয়ে পড়েছে কেশরতা, বিনাহালী, মঙ্গলপুর, মুরইল, দেলুঞ্জ, ছাতনী-ঢেকড়াসহ প্রায় ৭৫টি গ্রামে। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে তাঁতিরা এখন মাকু ছানার হাত ও পা চালিত তাঁত মেশিনের পরিবর্তে ব্যবহার করছেন বৈদ্যুতিক তাঁত।
শীত এলেই বেড়ে যায় চাহিদা, তাই সারা বছর কম্বল ও চাদর তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা। পরিবারের ছোট-বড় সবাই মিলে এখন তাঁতে ব্যস্ত। তবে উৎপাদন খরচ বাড়লেও তাদের তৈরি চাঁদর কম্বলের দাম বাড়েনি। এদিকে তাঁত পল্লীকে ঘিরে গড়ে ওঠা হাতে বোনা কম্বলের প্রসিদ্ধ দেশের বৃহৎ হাট ‘শাঁওলের হাট’ জমে উঠে ভোর ৪টা থেকে। সপ্তাহের দুই দিন রোববার ও বুধবার ভোর থেকে বিকিকিনি শুরু হয় হাটে। গোটা দেশ থেকে পাইকারি ক্রেতারা আসে প্রতিদিন।
তাঁতের খট খট শব্দে আর সুতার বুননে মিশে আছে তাদের স্বপ্ন। শাওলসহ আশে-পাশের গ্রামের মানুষরা আঁকড়ে আছে আদি শিল্প। একটানা তাঁতের খট খট শব্দে মুখরিত গ্রামের পরিবেশ, আর নারী-পুরুষ সহ নানা পেশার মানুষের কর্ম ব্যস্ততা। কেউ সুতা ছাড়াচ্ছে আবার কেউ বা চরকা নিয়ে বসে সুতা নলি বা সূচিতে ওঠাচ্ছে কেউ বা সুতা ববিন করছে। কোনটা চাকাওয়ালা আবার একেবারেই বাঁশ কাঠ দিয়ে হাতের তৈরি তাঁতও রয়েছে। বিভিন্ন গার্মেন্টসের সোয়েটারের সুতা প্রক্রিয়া করে তাঁতে বুনিয়ে তৈরি হয় কম্বল, চাঁদর, মাফলার, বেডকভারসহ আনুষঙ্গিক পণ্য। তাঁতিরা সুতা বোনাসহ গায়ের চাদর, কম্বল, বিছানার চাদর, লেডিস চাদর, লুঙ্গি, গামছা, তোয়ালেসহ নানা ধরনের শীত বস্ত্র তৈরি করে।
জেলার আদমদিঘি ও দুপচাঁচিয়া উপজেলার অর্ধশত গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা কম্বল পল্লীতে বছর জুড়েই এসব বস্ত্র তৈরি হলেও শীতকালে চাহিদা বেড়ে যায়। সরকারিভাবে শীতকালে বিতরণ করা কম্বলের সিংহভাগই উৎপাদন হয় শাওইল গ্রামে। ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকায় কম্বল, চাঁদর প্রকারভেদে ১০০ থেকে ৪৫০ টাকা। শাওলের হাটে দোকান রয়েছে ছোট বড় মিলে প্রায় ২ হাজারটি।
স্থানীয়রা জানান, খুব উন্নত মানের চাদর হওয়ায় এই চাদরের চাহিদা বাংলাদেশে ব্যাপক আর এই চাদরগুলো পৃথিবীর নানা দেশেও যায়। বিভিন্ন গার্মেন্টসের সোয়েটারের সুতা প্রক্রিয়া করে তাঁতে বুনিয়ে তৈরি হয় কম্বল, চাদরসহ আনুষঙ্গিক পণ্য। কোনো ধরনের প্রচার ও সহযোগিতা ছাড়াই এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এই কর্মক্ষেত্র। চাদর তৈরির পাশাপাশি এখানে গড়ে উঠেছে শীত বস্ত্র তৈরির মেশিন, সুতা, রং, তাঁতের চরকা, তাঁত মেশিনের সরঞ্জাম ও লাটায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বাজারের আশপাশে গড়ে উঠেছে ছোট বড় অনেক দোকান। দোকানগুলোতে বেচাকেনায় নিয়োজিত কয়েক হাজার হাজার শ্রমিক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত ক্রেতারা আগের দিন এসে অবস্থান নেয় হাটের আশে-পাশের বিক্রেতাদের বাড়িতে। সকাল ১০টার মধ্যেই চাহিদা মতো পণ্য কিনে ক্রেতারা রওনা দেন গন্তব্যের উদ্দেশে।
হাটের ইজারাদাররা জানান, প্রতি হাটে প্রায় কোটি টাকার কম্বল, চাদর, উলের সুতা বিক্রি হয় সেখানে। হাটকে ঘিরে কর্মসংস্থান হয়েছে শতশত বেকারের। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীদের চাদর কম্বল আর সুতা কেনার প্রতিযোগিতা।
জানা গেছে, ১৯৭৭ সাল থেকে এ হাট শুরু আদমদিঘী উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের শাওইল গ্রামে। হাট কেন্দ্র করে আদমদিঘী, দুপচাঁচিয়া, কাহালু, জয়পুর-হাটর জেলার আক্কেলপুর, নওঁগা সদর উপজেলার অর্ধশত গ্রামের মানুষ এ পেশার সঙ্গে জড়িত।
উত্তরবঙ্গের এই তাঁতি গোষ্ঠী আজও ধরে রেখেছে তাঁত সংস্কৃতি। বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের ছোট একটি গ্রাম শাওইল। এ গ্রামে ভিন্নধর্মী হাট গড়ে ওঠে। যার মূল শীতের চাদর কম্বল উলের (উলেন) সুতা কেনা-বেচা। পর্যায় ক্রমে এই হাটের প্রাচীনতা আর জনপ্রিয়তার জন্য এবং চাদর কম্বল মূলত এই হাটে বেচা-কেনা হয় বলে এই হাটের নাম দিয়েছে মানুষ ‘চাদর কম্বল হাটের গ্রাম’। ভোর রাত আনুমানিক ৪টা থেকে শুরু হওয়া এই হাট চলে দুপুর পর্যন্ত। আর হাটের বার হলো রবি ও বুধ। তাছাড়া এই হাট বসে প্রতিদিনই। গোটা শীত মৌসুমে প্রায় ৪০টি হাটে ৫০ কোটি টাকার বেচা কেনা হয়।
সারাবছর এ হাট ও তাঁত পল্লি চলমান থাকলেও শীত এলেই তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। পরিবারের সবাই মিলে এই কাজ করে বলে উৎপাদন খরচ কিছুটা কম হয়।
সুমি নামের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক বালিকা চরকায় সুতা কাটতে কাটতে জানালেন, তারা পরিবারের সবাই এ কাজ করে থাকেন। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে তারা মা-বাবাকে সহযোগিতা করছেন।

৭০ বছর বয়সী মাজহার আলি আকন্দ জানান, বাপ দাদার আমল থেকে তারা তাঁতী পেশায় রয়েছেন। আগে কটন সুতার কাজ করলেও এখন সোয়েটারের সুতা থেকে শীতবস্ত্র তৈরি করেন। গার্মেন্টসের রিজেক্ট হওয়া সোয়েটার কেটে সুতা বের করে তাতে রং লাগিয়ে চরকায় সুতা বুনে তাঁতে কম্বল, চাঁদর তৈরি করা হয় বলে তিনি জানান। এছাড়া গার্মেন্টসের পুরাতন সুতা, উলের নতুন সুতা তারা শীতবস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করেন।
শাঁওল গ্রামের তাঁতী পরাগ জানালেন, তারা একদিন সুতা কিনবে, তাতে রং করে শুকিয়ে নিয়ে প্রসেসিং করে তারপর তাঁতে উঠে বস্ত্র তৈরি হয়।
শাওইল হাট ও বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বলেন, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত লট থেকে সুতা বাছাই, ফেটি তৈরি কিংবা সুতা সাজিয়ে রাখে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে সুতা নিতে আসে ক্রেতারা। তাঁত শিল্পীদের পর্যাপ্ত মূলধনের জোগান, সুস্থভাবে বাজারজাতকরণের সুযোগ এবং ঠিকমতো কাঁচামাল সরবরাহ করলে এখনও আগের মতো জনপ্রিয় আর গৌরবময় করে তোলা যায় এদেশের তাঁত শিল্পকে। এদেশের শিল্প সৌন্দর্যেও এক ধারাকে বাঁচানো যায় ধ্বংসের হাত থেকে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও চাঁদর-কম্বলের দাম না বাড়ায় হতাশা ব্যক্ত করে তিনি ব্যাংক ঋণসহ সরকারি সুযোগ সুবিধার দাবি জানান।
এদিকে সারাদেশ থেকে শীতবস্ত্র কিনতে যান ক্রেতারা। বাজারে চাহিদা প্রচুর। সেখান থেকে পণ্য পরিবহনেও কোনো সমস্যা হয় না। তবে রাস্তাঘাট, ক্রেতা-বিক্রেতাদের আবাসন সুবিধাসহ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীসহ স্থানীয়রা।
বগুড়া শহরের খোকন পার্ক এলাকার কম্বল ব্যবসায়ী দবির মিয়া বলেন, আমি শাঁওয়াল হাটে গিয়ে পাইকারি দামে কম্বল কিনে এনে শহরে প্রতি কম্বল ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশিতে বিক্রি করি। আমার ভালো লাভ হয়।
খবরওয়ালা/এসআর