খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২১ মে ২০২৫
গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি যেমন নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে, তেমনি রীতিমতো পাল্টে গেছে শোবিজ অঙ্গনের চিত্র। যে-সব শিল্পীরা এতদিন আওয়ামী লীগের ছায়ায় সুবিধাভোগ করছিলেন, তারা এখন পড়েছেন আইনি জটিলতা ও জনরোষের মুখে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৮ মে। জনপ্রিয় ঢাকাই চিত্রনায়িকা নুসরাত ফারিয়াকে থাইল্যান্ড যাবার পথে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে ভাটারা থানা ও সেখান থেকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে তোলা হলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। দু-দিন পর, ২০ মে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে জুলাইবিপ্লবকালীন ভূমিকা। ছাত্র-জনতার হত্যাকাণ্ডে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে নুসরাত ফারিয়ার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতে শেখ হাসিনার প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন, “প্রত্যেক মেয়ের মধ্যে একজন করে শেখ হাসিনা আছেন।” এ ধরনের মন্তব্য তাকে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
ফারিয়ার গ্রেফতারের পর শিল্পীদের একটি অংশ সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। আবার অনেকে বলেন, “আইনের চোখে সবাই সমান। অপরাধ করলে শিল্পী বলেই ছাড় পাওয়া যাবে— তা হতে পারে না।” হাসিনাপন্থী শিল্পীদের বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষ।
শুধু নুসরাত ফারিয়া নন—আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বহু আওয়ামী ঘনিষ্ঠ শিল্পীই পড়েছেন বিপাকে। কেউ আত্মগোপনে গেছেন, কেউ বিদেশে পালিয়েছেন, কেউবা পড়েছেন রাজনৈতিক মামলার ঘেরাটোপে। একসময় রাজপথে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শিল্পীরা আজ বাহবা পাচ্ছেন, আর হাসিনাপন্থী শিল্পীরা হচ্ছেন বঞ্চিত—শোবিজের মূলধারায় আর তাদের জায়গা মিলছে না।
আন্দোলনের পক্ষে থাকা শিল্পীরা এখন অনীহা প্রকাশ করছেন সরকারপন্থী শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে। ফলে শিল্পী সমাজে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দিয়েছে।
সরকার পতনের পর নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ সিনেমার কিছু অভিনয়শিল্পী। শেখ মুজিব চরিত্রে অভিনয় করা আরিফিন শুভ এবং শেখ হাসিনা চরিত্রে অভিনয় করা নুসরাত ফারিয়া এই সিনেমার মাধ্যমে সরকারঘনিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন। তৎকালীন সরকার থেকে শুভ পেয়েছিলেন রাজউক প্লট—যেটি ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে।
এছাড়া শেখ ফজিলাতুন্নেছা চরিত্রে নুসরাত ইমরোজ তিশা, শেখ রেহানার চরিত্রে সাবিলা নূর এবং শেখ লুৎফর রহমান চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী–এমন অনেকেই পড়েছেন জনতার সমালোচনায়।
বিগত সরকার আমলে কালো তালিকাভুক্ত থাকা অনেক শিল্পী বলছেন, আজকের পরিস্থিতি সেই সময়ের অন্যায় আচরণের প্রতিক্রিয়া। শোবিজের কিছু অংশ বলছে, যারা রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে দলের হয়ে কাজ করেছেন, তারা আসলে আর নিরপেক্ষ শিল্পী ছিলেন না—তাই এখন তাদের প্রতিফল পাচ্ছেন।
‘আলো আসবেই’ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের স্ক্রিনশট ফাঁস, বিটিভি পরিদর্শন এবং অভিনয়শিল্পী সংঘের সরকারি অবস্থান গ্রহণ নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। আন্দোলনের সময় সরকারের পক্ষ নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত এখন অনেক শিল্পীকে জনরোষে ফেলেছে।
দেশের শোবিজ অঙ্গন আজ শুধুই বিনোদনের কেন্দ্র নয়, বরং এক রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দান। শিল্পীরা এখন আর কেবল অভিনয় বা গান নিয়ে থাকছেন না—তারা হয় আন্দোলনের পক্ষে, নয়তো ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতার দায়ে অভিযুক্ত। এই বিভাজন কবে কাটবে, তা কেউ জানে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে রাজনীতি এখন অনিবার্য বাস্তবতা।