তুলির আঁচড়ে জীবন আঁকা শিল্পী এস. এম. সুলতান

বাংলার মাটি ও মানুষের অনন্ত প্রাণশক্তিকে তুলির জাদুতে অমর করে যাওয়া এক বিস্ময়কর নাম — এস. এম. সুলতান।

১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম তাঁর। পিতা মেছের আলী ছিলেন রাজমিস্ত্রি, মা মাজু বিবি গৃহিণী। দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা এই ‘লাল মিয়া’ নামের ছেলেটিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী।

শৈশবে পড়াশোনার ফাঁকে পিতার রাজমিস্ত্রির কাজে সহায়তা করতেন, অবসরে আঁকতেন ছবি। ১৯৩৩ সালে মাত্র পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় জমিদার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি এঁকে সাড়া ফেলে দেন। সেই থেকে নড়াইলের জমিদারবাড়িগুলোতেও তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৩৮ সালে পড়ালেখা ছেড়ে চলে যান কলকাতায়। সেখানে চিত্রসমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তাঁরই উদ্যোগে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ছাড়াই ১৯৪১ সালে ভর্তি হন কলকাতা আর্ট স্কুলে—শিল্পপ্রতিভার যে স্বীকৃতি খুব কম মানুষই পায়।

১৯৫৩ সালে তিনি ফিরে আসেন প্রিয় নড়াইলে। শহুরে যশ-খ্যাতির মোহ ত্যাগ করে গ্রামীণ জীবনের কাছেই খুঁজে নেন অনুপ্রেরণার উৎস। শিশু-কিশোরদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি চারুকলার চর্চার সুযোগ তৈরি করেন।

১৯৬৯ সালের ১০ জুলাই প্রতিষ্ঠা করেন ‘দি ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্ট’, যার উদ্বোধন করেন তৎকালীন যশোরের জেলা প্রশাসক ইনাম আহম্মদ চৌধুরী। পরবর্তীতে তিনি গড়ে তোলেন স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘শিশুস্বর্গ’, যেখানে শিশুদের শিল্পচর্চা ও সৃজনশীল বিকাশের স্বপ্ন লালন করতেন সুলতান।

তাঁর জীবনে ছিল এক অনন্য বৈচিত্র্য—চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি বাঁশি বাজানো, পশুপাখি পালন, প্রকৃতি ও জীবনের প্রতি গভীর মমতা। হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-অহংকার ছিল তাঁর একান্ত অপছন্দের বিষয়।

তাঁর তুলিতে গ্রামীণ মানুষ, কৃষক, শ্রমজীবী, প্রকৃতি—সবই নতুন রূপে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সেই শক্তিশালী, বলিষ্ঠ কৃষকই যেন তাঁর শিল্পে বাংলার আসল মুখ।

এস. এম. সুলতান পেয়েছেন অসংখ্য স্বীকৃতি—

১৯৮২ সালে একুশে পদক,

১৯৮৪ সালে রেসিডেন্ট আর্টিস্ট উপাধি,

১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা,

১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক।

দেশের বাইরেও পেয়েছেন অনন্য সম্মান

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দিয়েছে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’,
নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার দিয়েছে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’,
আর এশিয়া উইক পত্রিকা তাঁকে ঘোষণা করে ‘ম্যান অব এশিয়া’।

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর নিভে যায় এই আলোকিত প্রাণের জীবনপ্রদীপ।
তবু তিনি রয়ে গেছেন তাঁর তুলির আঁচড়ে, মাটির গন্ধে, কৃষকের ঘামে, নদীর ঢেউয়ে—
বাংলার আত্মা হয়ে।

এস. এম. সুলতান—বাংলার মহাকাব্যিক শিল্পী, যিনি তুলির টাননে গড়েছেন মানুষের মহিমা।

 

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।